ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সাংবাদিক সীমা চিশতি দ্য ওয়্যারে তার নিবন্ধে যুক্তি দিয়েছেন, প্রতিবাদ ও বিরোধিতাকে অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে বিজেপি কার্যত স্বীকার করে নিচ্ছে যে ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাতে শুরু করেছে। গত ১২ অক্টোবর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে লেখা নিবন্ধটিতে তিনি দেখিয়েছেন, মোদি সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের পরিসর ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। আন্দোলনে শুধু প্রচলিত বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিই নয়, বরং তরুণ, নাগরিক সমাজ এবং একসময় বিজেপির প্রতি সমর্থনকারী বলে বিবেচিত বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সীমা চিশতির বিশ্লেষণে, এই পরিবর্তনের তাৎপর্য হলো—বিজেপির রাজনৈতিক আধিপত্য আর আগের মতো প্রশ্নাতীত নয়।
মোদি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে ভারতের উন্নয়নের প্রধান রূপকার হিসেবে তুলে ধরেছেন। ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে উন্নত দেশে পরিণত করার যে লক্ষ্য তিনি সামনে এনেছেন, তা তার রাজনৈতিক বয়ানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বিজেপির বক্তব্য ও আচরণের মধ্যে একধরনের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে সরকার উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অন্যদিকে সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে তাদের আন্দোলনকে সরকার পতনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখাচ্ছে। এর ফলে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: সরকার কি জনগণের সমর্থনের ওপর আস্থা রাখছে, নাকি বিরোধিতাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর ক্রমবর্ধমানভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?
গণতন্ত্রে জনগণের সমালোচনা করার অধিকার এবং সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ রাষ্ট্রের বৈধতারই অংশ। কোনো সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলেই তা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড হয়ে যায় না। একইভাবে, ক্ষমতাসীন দলকে পরাজিত করে অন্য কোনো দলকে ক্ষমতায় আনার দাবি গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু প্রতিবাদকে যখন শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তখন রাজনৈতিক বিরোধিতাকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সীমা চিশতির যুক্তি হলো, বিজেপি নিজেই ‘সরকার পরিবর্তন’ বা ‘রেজিম চেঞ্জ’ প্রসঙ্গ সামনে এনে ক্ষমতার পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। যে সম্ভাবনাকে দলটি ভয় হিসেবে উপস্থাপন করছে, সেটিই এখন জনগণের কাছে একটি বাস্তব গণতান্ত্রিক বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও একটি যোগসূত্র রয়েছে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তরুণদের অসন্তোষ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সীমা চিশতি লিখেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলোতে তরুণদের নেতৃত্বে বা তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে সংঘটিত আন্দোলনের অভিজ্ঞতার কারণে মোদি সরকারও এ ধরনের প্রতিবাদের বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিজেপির সরকারি বক্তব্যে ‘জেন-জি’ শব্দটির পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত সাধারণ ‘তরুণ’ শব্দ ব্যবহারের প্রবণতাও এই সংবেদনশীলতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে মোদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওগুলো জনপরিসরে বিদ্রূপ ও সমালোচনার মুখে পড়েছে।
তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভারতের পরিস্থিতিকে পুরোপুরি এক করে দেখা যাবে না। প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতার কাঠামো, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও আন্দোলনের ধরন আলাদা। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ শিক্ষা রয়েছে, তরুণদের ক্ষোভকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা হলে তা বিচ্ছিন্ন অসন্তোষ থেকে বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, শিক্ষাব্যবস্থা, দুর্নীতি, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকার যখন একই সঙ্গে প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ভারতের বর্তমান আন্দোলনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বিরোধী দল, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, দিল্লির সাবেক লেফটেন্যান্ট গভর্নর এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন। সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে কার্যকর সংলাপের জায়গা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় দিল্লি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর উপস্থিতিই পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রধান দৃশ্যমান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এই পর্যবেক্ষণ ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে একটি গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে।
নির্বাচন কমিশন কেবল নির্বাচন পরিচালনার প্রশাসনিক সংস্থা নয়; গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তার। তাই কমিশনের সিদ্ধান্ত, নিয়োগপ্রক্রিয়া ও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিরোধী দল যদি মনে করে যে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তাহলে সেই অভিযোগের গ্রহণযোগ্য জবাব দেওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের জন্যও স্বচ্ছ তদন্ত, তথ্য প্রকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ব্যবস্থা দরকার। অভিযোগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলে বা তাদের বক্তব্যকে কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দেওয়া হলে অবিশ্বাস আরও বাড়তে পারে।
সীমা চিশতির বিশ্লেষণে, নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে এই বিরোধ ‘ভোট চুরি’ বা নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তার মতে, আগে যে বিষয়গুলো মূলত আদালত, বিশেষজ্ঞ মহল কিংবা সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেগুলো এখন সাধারণ মানুষের আলোচনায় উঠে এসেছে। এর ফলে নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক আর কেবল সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক আলোচনায় আটকে থাকছে না; তা মানুষের ন্যায়বিচার, সমান অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তন বিজেপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন জনপরিসরে ছড়িয়ে পড়লে সরকার কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনার মুখোমুখি হয় না, বরং বৃহত্তর জনমতের কাছেও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হয়।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিজেপির সংসদীয় অবস্থান। সীমা চিশতি উল্লেখ করেছেন, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি ২৪০টি আসন পেয়েছে, যা দলটিকে আগের তুলনায় সীমিত সংসদীয় অবস্থানে নিয়ে এসেছে। এই বাস্তবতা সরকারের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতার পর এখন বিজেপিকে সংসদে অন্য দলের অবস্থান, বিরোধীদের রাজনৈতিক তৎপরতা এবং জনমতের পরিবর্তনের বিষয়গুলো আরও সতর্কভাবে বিবেচনা করতে হচ্ছে। যে দল একসময় নিজের রাজনৈতিক প্রাধান্যকে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরত, তার জন্য এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে একটি নতুন পরীক্ষা।
বিজেপির উদ্বেগের একটি লক্ষণ হিসেবে সীমা চিশতি এমন কিছু রাজনৈতিক দলের অবস্থান পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা অতীতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলটিকে সহযোগিতা করেছে। ওয়াইএসআর কংগ্রেস পার্টি এবং বিজু জনতা দল এখন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ দাবি করছে। ওয়াইএসআর কংগ্রেসের নেতা জগন মোহন রেড্ডি ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগসংক্রান্ত বিতর্কিত আইনকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলেও মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে, তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ দাবি করেছেন। সীমা চিশতির মতে, এসব ঘটনা বিজেপির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ যেসব রাজনৈতিক শক্তিকে একসময় প্রয়োজনে সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা যেত, তাদের মধ্যেও এখন সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এখানে মূল বিষয় শুধু কয়েকটি দলের অবস্থান পরিবর্তন নয়; বরং রাজনৈতিক অসন্তোষ কীভাবে দলীয় সীমারেখা অতিক্রম করতে পারে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থ ও মতাদর্শের দলগুলো যখন কোনো একটি প্রশ্নে একমত হতে শুরু করে, তখন ক্ষমতাসীন দলের জন্য পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ, তখন আন্দোলনকে একটি নির্দিষ্ট দলের কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপন করে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব খাটো করা সহজ থাকে না। তবে এই ধরনের ঐক্য কত দিন স্থায়ী হবে, কিংবা তা নির্বাচনী সমঝোতায় রূপ নেবে কি না, সে বিষয়ে নিবন্ধে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। বরং সীমা চিশতির বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, বিজেপির জন্য তাৎক্ষণিক উদ্বেগের কারণ হলো বিরোধিতার বিভিন্ন ধারা একই ইস্যুতে মিলিত হওয়ার সম্ভাবনা।
অর্থনৈতিক অসন্তোষ এই রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা তুলে ধরা হলেও সীমা চিশতির মতে, এই পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের অসন্তোষ দূর করতে পারছে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হলে সরকারের উন্নয়নের বয়ান রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বাড়লেও যদি মানুষের জন্য নিরাপদ কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয়, প্রকৃত আয় না বাড়ে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সম্পর্কে জনগণের আস্থা কমে যেতে পারে।
নিবন্ধে ভারতের তরুণ, শহুরে ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং গ্রামীণ মজুরি স্থবিরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কারণে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার পরিমাপ অনুযায়ী, ভোক্তাদের আস্থা দীর্ঘ সময় ধরে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে বলে সীমা চিশতি লিখেছেন। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আর কেবল নীতিনির্ধারণী আলোচনার বিষয় থাকছে না; তা সরকারের জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হচ্ছে।
বিনিয়োগ পরিস্থিতিও সরকারের জন্য উদ্বেগের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। সীমা চিশতির নিবন্ধ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ—উভয় ক্ষেত্রেই বিদেশি পুঁজির বহির্গমন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্কের অভাব শিক্ষিত ভারতীয়দের এইচ-১বি ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রুপির মূল্যহ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং শেয়ারবাজারের অস্থিরতাও সরকারের অর্থনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই পরিস্থিতির একটি বিশেষ রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। অর্থনৈতিক অসন্তোষ যদি কেবল দরিদ্র বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সরকার একে নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক শ্রেণির সমস্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পেতে পারে। কিন্তু কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, আয় ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ যখন মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত তরুণ এবং একসময় সরকারের সমর্থক হিসেবে বিবেচিত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে, তখন অসন্তোষের রাজনৈতিক প্রভাব আরও ব্যাপক হয়। সীমা চিশতির বক্তব্য অনুযায়ী, মোদি সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ এবং ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ বর্তমান বিক্ষোভের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণই অর্থনৈতিক বিতর্ককে রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সরকারের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে সম্ভাব্য পরিবর্তনের মাধ্যমে। সীমা চিশতি যুক্তি দিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী জনবিক্ষোভ আমলাদের রাজনৈতিক ঝুঁকি মূল্যায়নের ধরন বদলে দিতে পারে। কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকবে বলে ধারণা থাকলে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রণোদনা এক রকম হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা দৃশ্যমান হলে বর্তমান সিদ্ধান্তগুলোর ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা কিংবা জবাবদিহির আশঙ্কা তাদের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
নিবন্ধে জুলাই মাসে ছাত্র আন্দোলনের পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। লেখক এ ঘটনাকে প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টির একটি কারণ হিসেবে দেখেছেন। একই সঙ্গে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের ঘটনাকে তিনি মোদি সরকারের নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ফাটলের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে এসব পর্যবেক্ষণ থেকে প্রশাসনের সামগ্রিক অবস্থান বদলে গেছে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বরং লেখকের মূল বক্তব্য হলো, সরকারের বিরুদ্ধে জনমত শক্তিশালী হলে প্রশাসনের ভেতরেও সিদ্ধান্ত, আনুগত্য ও ভবিষ্যৎ জবাবদিহি নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হতে পারে।
গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রবাহের পরিবর্তনও এই পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সীমা চিশতি উল্লেখ করেছেন, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজ এবং রয়টার্স-অক্সফোর্ডের জরিপে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুরুত্ব উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে ও পরে পরিচালিত জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি মানুষ তথ্যের জন্য প্রধানত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করেছেন। এর ফলে প্রচলিত টেলিভিশনভিত্তিক রাজনৈতিক বয়ানের বাইরে স্বাধীন সংবাদ, ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ বেড়েছে।
বিজেপির জন্য এর তাৎপর্য হলো, রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়বস্তু ও তার ব্যাখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচন কমিশনের নিয়োগপ্রক্রিয়া, বিচার বিভাগের জবাবদিহি কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার মতো জটিল বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহজবোধ্য ব্যাখ্যার মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আর বিশেষজ্ঞ বা আইনজীবীদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। সাধারণ মানুষও এসব প্রশ্নকে নিজেদের জীবনের ন্যায়বিচার, অধিকার ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখতে শুরু করে।
এই পরিবর্তনকে সীমা চিশতি সাংবাদিক রবি শঙ্করের ব্যবহৃত ‘ভীতির অবসান’ ধারণার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখার প্রবণতা দুর্বল হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদ এবং সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে ন্যায়বিচারের দাবি নিয়ে মিছিল সেই পরিবর্তনের উদাহরণ। এর অর্থ এই নয় যে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে; বরং তাদের ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলার সামাজিক পরিসর বিস্তৃত হচ্ছে। বিজেপির জন্য সমস্যাটি এখানেই—প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ককে আর কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি প্রশ্ন হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা যাচ্ছে না।
তরুণ ও নারীদের সমর্থন নিয়ে বিজেপির রাজনৈতিক দাবিও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দলটি ‘এমওয়াই’ বা ‘মহিলা ও যুব’ জনগোষ্ঠীকে নিজেদের নির্বাচনী শক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু সীমা চিশতির মতে, নারীর সংরক্ষণ নিশ্চিত করার যুক্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস বিলের পক্ষে প্রচার চালিয়েও বিজেপি প্রত্যাশিত জনসমর্থন অর্জন করতে পারেনি। একই সঙ্গে তরুণদের কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সমস্যা সরকারবিরোধী অসন্তোষকে শক্তিশালী করছে।
নিবন্ধে নীতি আয়োগের হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ভারতে ৮ কোটি ৭০ লাখ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণের কোনো ক্ষেত্রেই যুক্ত নন। জাতিসংঘের জনসংখ্যাবিষয়ক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে ভারতের ১৮ থেকে ৩২ বছর বয়সী জেন-জি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৩৮ কোটি হতে পারে, যা দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এত বড় তরুণ জনগোষ্ঠীকে কেবল নির্বাচনী প্রচারের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে একত্র করা সম্ভব নয়। তবে চাকরির নিয়োগে বাধা, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং পুলিশের কঠোর আচরণের মতো অভিজ্ঞতা বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর তরুণদের মধ্যে অভিন্ন ক্ষোভ তৈরি করতে পারে।
এই জায়গায় দলিত তরুণ নেতা অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) উত্থানকে সীমা চিশতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, দীপকের দলিত পরিচয়ের সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মতো বৃহত্তর প্রশ্নকে যুক্ত করার সম্ভাবনা বিজেপির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিজেপি অতীতে দলিত নেতাদের সঙ্গে জোট, সমঝোতা কিংবা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে রাজনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করেছে। কিন্তু দলিত পরিচয়কে ভিত্তি করে একই সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণির তরুণদের সাধারণ সমস্যাকে সামনে আনা হলে সেই রাজনীতিকে প্রচলিত কৌশলে মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে।
তবে দীপকের রাজনৈতিক উদ্যোগ কতটা স্থায়ী হবে, কত বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে এবং সাংগঠনিকভাবে কতটা শক্তিশালী হবে, তা এখনো নির্ধারিত নয়। সীমা চিশতিও এ ক্ষেত্রে সংগঠন, রাজনৈতিক বিস্তার এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও এই উদ্যোগের তাৎপর্য হলো, সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে কর্মসংস্থান ও শিক্ষার মতো সর্বজনীন সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা। এতে জাতপাতভিত্তিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সবশেষে, বিজেপির রাজনৈতিক ইতিহাসই বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। সীমা চিশতি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে রাস্তায় আন্দোলন ও জনমত সংগঠিত করার মাধ্যমেই বিজেপি তার রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি সুদৃঢ় করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দলটি জানে, রাজপথের আন্দোলন কীভাবে বিচ্ছিন্ন ক্ষোভকে একত্র করতে পারে, নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারে এবং নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক বিতর্কের শর্ত বদলে দিতে পারে। ফলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলন বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা বিজেপির জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ।
সীমা চিশতির বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, মোদি সরকারের সামনে এখন শুধু একটি বিক্ষোভ দমনের প্রশ্ন নেই। বরং অর্থনৈতিক অসন্তোষ, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সম্ভাব্য ঐক্য—সব মিলিয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে। এই সংকটের মোকাবিলায় সরকার যদি সংলাপের পরিবর্তে দমনমূলক ব্যবস্থা, সমালোচনার জবাবে পাল্টা অভিযোগ এবং বিরোধিতাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার পথেই এগোয়, তাহলে আন্দোলনের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অভিন্ন প্রতিপক্ষের ধারণা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
‘সরকার পরিবর্তন’ নিয়ে বিজেপির উদ্বেগ তাই নিজেই একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। যে দল দীর্ঘদিন ধরে নিজের নেতৃত্বকে ভারতের ভবিষ্যতের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছে, তাকে এখন সেই ধারণার বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। গণতন্ত্রে কোনো নেতা বা দলের ক্ষমতায় থাকা স্থায়ী অধিকার নয়; জনগণের সমর্থন, জবাবদিহি ও নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতার ওপর তার অবস্থান নির্ভর করে। বর্তমান আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ভারতের রাজনীতিতে কত বড় পরিবর্তন আনবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু সীমা চিশতির নিবন্ধের যুক্তি অনুযায়ী, পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ভয় হিসেবে তুলে ধরার মধ্য দিয়েই বিজেপি এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে, যেখানে ক্ষমতার বিকল্প নিয়ে আলোচনা আর সহজে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।