প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রস্তাবে ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ইরানের প্রধান তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলা, দেশীয়ভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থামানো।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ তেলপথ হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়ার কথাও প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ইরানের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ করে ইরানের সঙ্গে আলোচনার ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় সোমবার যুদ্ধ বন্ধের আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেছেন, ইরান এখন একটি সমঝোতার দিকে এগোতে আগ্রহী এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি থেকে সরে আসতেও রাজি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
এদিকে গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শেষ করতে ট্রাম্প যে ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনার কথা বলেছেন, তা মূলত প্রায় এক বছর আগের একটি প্রস্তাবের পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা। তাদের মতে, এ পরিকল্পনা ইরানকে সন্তুষ্ট করতে পারবে—এমন সম্ভাবনা কম।
কূটনীতিকদের ধারণা, ট্রাম্পের আলোচিত এই পরিকল্পনাটি ২০২৫ সালের মে মাসে তার আলোচক দল যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ওই সময় ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা চলছিল। তবে ইসরায়েলের বিমান হামলার পর সেই আলোচনা ভেঙে যায়।
বর্তমান পরিকল্পনায় কী পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। কূটনীতিকদের একটি অংশ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো বড় পরিবর্তন আনেনি। এমনকি একটি নতুন প্রস্তাব তৈরি করা হলেও তা এখনো ইরানের কাছে উপস্থাপন করা হয়নি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে “ভালো ও ফলপ্রসূ” আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে, যাতে “১৫ দফা সমঝোতা” হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের নতুন নেতৃত্ব আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হামলার ক্ষতিপূরণসহ অতিরিক্ত দাবি তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কূটনীতিকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই প্রস্তাবের অনেক দিকই পুরোনো হয়ে গেছে। ২০২৬ সালে ইতিমধ্যে আরও কয়েক দফা আলোচনা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ অবস্থায় নতুন করে আলোচনা হলে তা সম্ভবত পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে হতে পারে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এ ধরনের আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আলোচনায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ভবিষ্যতে সামরিক হামলা না করার নিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে পারে।
এদিকে, এই সংঘাত নিয়ে জি-সেভেন দেশগুলোর মধ্যেও মতভেদ দেখা গেছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেনি এবং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ইসরায়েলের প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে তাদের ১৫ দফা প্রস্তাব পাঠিয়েছে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান বলেছে যে তারা নির্ধারিত সময়সীমা পূরণ করতে পারবে না, কারণ শাসকগোষ্ঠীর নীতিনির্ধারকরা হামলার শিকার হওয়ার ভয়ে যোগাযোগ বা বৈঠক করতে প্রচণ্ড অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
প্রতিবেদন অনুসারে, ইরান শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে তারা প্রস্তাবটি বিবেচনা করবে, তবে এও জোর দিয়ে বলেছে যে কিছু বিষয় তারা কখনোই গ্রহণ করবে না।