ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্যা গার্ডিয়ান বলছে, যুদ্ধের শুরুতে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতেই ছিল বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই অবস্থান এখন আর আগের মতো নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যুদ্ধের ইতিহাস
গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় বড় সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, গালফ যুদ্ধ, আফগানিস্তান যুদ্ধ এবং ইরাক যুদ্ধ। এসব যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কখনও দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সরে এসেছে, আবার কোথাও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ইরান সংকটে যুক্তরাষ্ট্র এক ভিন্ন ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। কারণ এখানে শুধু সামরিক লড়াই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতির মতো বড় বিষয়ও সরাসরি জড়িয়ে গেছে।
সংঘাতের শুরু ও পাল্টা হামলা
এই যুদ্ধের সূচনা হয় ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার মাধ্যমে। ওই হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
এর জবাবে ইরান ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েলের দিকে। যদিও ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অধিকাংশ হামলা প্রতিহত হয়।
হরমুজ সংকটেই বদলে যায় সমীকরণ
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মোড় আসে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়। প্রণালি বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
ফলে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপও বাড়তে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধের সময়সীমা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করলেই যুদ্ধ শেষ হতে পারে।
কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখল বা ধ্বংসের মতো পদক্ষেপ নিতে পারে। এতে ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। তবে এমন পদক্ষেপ পুরো সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করে তুলতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
কার হাতে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ?
হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়-এর সামরিক ইতিহাসের অধ্যাপক ড্যানি অরবাখ মনে করেন, যুদ্ধের কৌশলগত উদ্যোগ এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতেই রয়েছে।
তবে কিং কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ পিটার নয়মান ভিন্ন মত দিয়েছেন। তার মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে ইরান এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকে কল্পনা করেনি।
আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার
এদিকে ইরানপন্থি বিভিন্ন সংগঠনও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ ইতোমধ্যে ইসরায়েলের ওপর ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননে বিমান হামলা চালিয়েছে, যাতে শত শত মানুষ নিহত ও লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
অচলাবস্থার দিকে যুদ্ধ?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের কৌশলগত অচলাবস্থার মুখে পড়েছে। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় সংকটে পড়তে পারে, আবার দ্রুত সরে আসলেও তা রাজনৈতিকভাবে বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ‘না পুরোপুরি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারছে, না সহজে বেরিয়েও আসতে পারছে’—আর এই চাপের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে হরমুজ প্রণালি ও বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতি।