গত মাসে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে সম্মিলিত নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। চুক্তিটি স্বাক্ষরের সময় তিন দেশ যৌথ প্রতিরোধ সক্ষমতার কথা বললেও, সৌদি আরবের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পর পাকিস্তান ও তুরস্ক সরাসরি সামরিকভাবে কতটা এগিয়ে আসবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গত মাসে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির ঘোষিত কাঠামো অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনও একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। তবে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তার বিস্তারিত প্রক্রিয়া শুরু থেকেই পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না।
সাম্প্রতিক হুতি হামলার পর সেই অস্পষ্টতাই আরও সামনে এসেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত থাকলে মক্কা চুক্তি কার্যকর করার সময় এসেছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরবে চুক্তির আওতায় কিছু সামরিক মোতায়েন ইতোমধ্যে রয়েছে। তবে এসব মোতায়েনের ধরন ও পরিসর প্রকাশ করা হয়নি।
সৌদি অবকাঠামোয় হামলা, বাড়ছে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে ঝুঁকি। সৌদির ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার পর সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পর পাইপলাইনটি সৌদি তেল রফতানির জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাইপলাইনে হামলাটি ইরাকের ভূখণ্ড থেকে ড্রোনের মাধ্যমে চালানো হয়েছিল বলে বাগদাদ ও রিয়াদ জানিয়েছে। তবে কোনও গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেনি। সৌদি কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিপ্রেক্ষিতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেয়।
এদিকে ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মক্কার দক্ষিণে হুতিদের উৎক্ষেপিত একটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। পাকিস্তানও এ ঘটনায় সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।
বাব আল-মানদেব ঘিরে নতুন সমীকরণ
হুতিদের সাম্প্রতিক স্থলঅভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের পর হুতিরা কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করে। লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত মোখা বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি হওয়ায় এর নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মোখা দখলের ফলে বাব আল-মানদেবের দিকে হুতিদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে হুতিদের হুমকি। হরমুজ প্রণালির সংকটের কারণে সৌদি আরব যখন লোহিত সাগরমুখী বিকল্প রুটের ওপর বেশি নির্ভর করতে চাইছে, তখন বাব আল-মানদেব এলাকায় হুতিদের শক্ত অবস্থান রিয়াদের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
কেন সরাসরি যুদ্ধে যাচ্ছে না পাকিস্তান?
বিশ্লেষণধর্মী লেখাটিতে পাকিস্তানের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ না করার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘ সীমান্ত ও সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি।
পাকিস্তান একই সময়ে পূর্ব সীমান্তে ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা উত্তেজনা, পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আফগানিস্তানকেন্দ্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং দেশের ভেতরে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। ফলে ইরান-সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে জড়ালে পাকিস্তানের জন্য নতুন একটি আঞ্চলিক সংঘাতের দ্বার খুলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
তবে পাকিস্তান রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সৌদি আরবের প্রতি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছেন এবং সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সংযম ও কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠছে তুরস্কের ভূমিকা নিয়েও
মক্কা চুক্তির আরেক অংশীদার তুরস্কও এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও সামরিক শিল্প শক্তিশালী হওয়ায় সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে আঙ্কারার স্বার্থ রয়েছে।
তবে চুক্তির আওতায় তুরস্ক সরাসরি ইয়েমেন যুদ্ধে অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে কোনও প্রকাশ্য সিদ্ধান্ত নেই। বরং চুক্তির কাঠামোকে প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যম হিসেবে কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
চুক্তির সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে কেউ কেউ মনে করছেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য এটি তাৎক্ষণিক সামরিক জোটের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা-ব্যবস্থা ও প্রতিরোধ কাঠামো হিসেবে বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক হামলাগুলো সেই প্রতিরোধের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
‘কাগুজে বাঘ’ বিশ্লেষকদের বিতর্ক
মূল বিশ্লেষণধর্মী লেখাটিতে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে তীব্র সমালোচনা করে ‘কাগুজে বাঘ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। লেখকের যুক্তি, সৌদি আরবের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে একের পর এক হামলার পরও পাকিস্তান ও তুরস্ক সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়ায় না যাওয়ায় চুক্তিটির প্রতিরোধমূলক ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
তবে এটি একটি বিশ্লেষণধর্মী মতামত, প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়। বাস্তবে পাকিস্তান ইতোমধ্যে সৌদি আরবে কিছু সামরিক মোতায়েনের কথা নিশ্চিত করেছে এবং বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটি সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ত্রিপক্ষীয় মক্কা চুক্তি ‘উদ্দেশ্য ও চেতনা অনুযায়ী’ বাস্তবায়ন করবে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও বলেছেন, হুতিদের হামলা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সরাসরি আগ্রাসনে রূপ নিলে মক্কা চুক্তি কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ চুক্তিটি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনও নেই।
সৌদি আরবের জন্য সামনে কঠিন সমীকরণ
এদিকে সৌদি আরবের সামনে এখন একসঙ্গে কয়েকটি চ্যালেঞ্জ—হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা, বাব আল-মানদেবে হুতিদের শক্তিশালী অবস্থান এবং জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা।
ফলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির কার্যকারিতা এখন শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে কি না, নাকি বাস্তব নিরাপত্তা সমন্বয়ে রূপ নেয়—সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের।