কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় আবার বসেছে সাধুর হাট। ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আখড়াবাড়িতে জড়ো হয়েছেন সাধু, গুরু, বাউল ও ভক্তরা। শনিবার (১৭ অক্টোবর) শুরু হওয়া তিন দিনের আয়োজন চলবে সোমবার পর্যন্ত। গান, সাধুসঙ্গ ও ভাববিনিময়ের এই সমাবেশের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষকে ভালোবাসার সাধনা। এবারের প্রতিপাদ্যও সেই দর্শনের স্মারক: ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে কুষ্টিয়া লালন একাডেমি। মূল আয়োজনের প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকেই ভক্তরা আখড়ায় আসতে শুরু করেছেন। বিভিন্ন স্থানে আসন পেতে তাঁরা গাইছেন লালনের গান। শনিবার সন্ধ্যায় বাল্যসেবা, রবিবার সকালে রাখালসেবা ও দুপুরে পুণ্যসেবার আয়োজন রয়েছে। থাকছে সাধুদের মধ্যে দর্শন ও ভাবের আদানপ্রদান।
আখড়ার সামনে বসেছে গ্রামীণ মেলা। দুই শতাধিক স্টলে পসরা সাজিয়েছেন বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা। উদ্বোধনী দিনের আলোচনা শেষে বিকেল ৫টায় লালনমঞ্চে সংগীত পরিবেশনের কথা রয়েছে। তবে সাধুর হাটের তাৎপর্য বোঝার জন্য মেলার বাইরেও তাকাতে হয়। লালনের গান যে মানবমর্যাদা, সমতা ও বিভেদ অতিক্রমের কথা বলা হয়েছে, গবেষকেরা তার সামাজিক গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেছেন।
লালন গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে লালনকে দেখেছেন ‘মরমি ও দ্রোহী’ হিসেবে। তাঁর মূল্যায়নে, জাতপাত, সম্প্রদায়বিদ্বেষ, শ্রেণিপীড়ন, সামাজিক অনাচার ও নারীর নিগ্রহের বিরুদ্ধে লালন আজীবন অবস্থান নিয়েছিলেন। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে আলোকিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার ওপরও জোর দেন এই গবেষক। ফলে লালনের মানবপ্রেমের সঙ্গে সামাজিক অন্যায়ের বিরোধিতাও গভীরভাবে যুক্ত।
এই সমাজভাবনার আরেকটি দিক উঠে এসেছে শেখ মেহেদী হাসানের গবেষণায়। জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব আর্টসের ‘লালন শাহ: আ বাউল বার্ড অব এগজিস্টেনশিয়াল হিউম্যানিজম’ প্রবন্ধে তিনি গান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, লালনের চিন্তার কেন্দ্রে মানুষ। ধর্মের বাহ্যিক চিহ্নের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ এবং শ্রেণি ও জাতভিত্তিক বৈষম্যকে প্রশ্ন করেছেন তিনি। নারীর মর্যাদার প্রশ্নও গবেষণাটিতে গুরুত্ব পেয়েছে।
ভারতের এসআরএম ইউনিভার্সিটি, অন্ধ্রপ্রদেশের গবেষক সায়ন্তন ঠাকুর ২০২৪ সালে কালচার অ্যান্ড রিলিজিয়ন সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় লালনের ‘মনের মানুষ’ ধারণা বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই ধারণা জাত ও ধর্মের প্রচলিত সীমানা অতিক্রম করে অন্তর্ভুক্তি এবং আধ্যাত্মিক সংযোগের পথ দেখায়। মানুষের মূল্য নির্ধারণে বাইরের পরিচয়ের বদলে অন্তর্গুণকে গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন।
গবেষণার সামাজিক প্রয়োগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে সায়ন্তনের বক্তব্য হলো, শিক্ষা, সামাজিক উদ্যোগ ও সমাজসংস্কারে লালনের চিন্তা যুক্ত করা যেতে পারে। বিদ্যালয় ও স্থানীয় কার্যক্রমে এই দর্শনের আলোচনা বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সহমর্মিতা এবং সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। আত্মসমালোচনা, নৈতিক বিকাশ ও অন্যের প্রতি মমতাকে তিনি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখেছেন।
এসব ব্যাখ্যার সম্ভাব্য প্রয়োগ হিসেবে বিদ্যালয়ে গান ও তার ভাবার্থ নিয়ে আলোচনা, পাড়ায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের যৌথ সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা শোনার উদ্যোগের কথা ভাবা যায়। সম্প্রদায় সম্পর্কে শোনা অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ব্যক্তির কাজের দায় পুরো গোষ্ঠীর ওপর না চাপানোর অভ্যাসও এখানে প্রাসঙ্গিক। এসব উদ্যোগের ফল জানার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
লালনের সাংস্কৃতিক অবদানও এই মানবিক অনুসন্ধানের সঙ্গে জড়িত। গবেষক জিন ওপেনশ ক্যারোল সলোমনের ‘সিটি অব মিররস: সংস অব লালন সাঁই’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, লালন নিজের হিন্দু বা মুসলমান জন্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন গ্রহণ করতে চাইতেন না। এ ধরনের বিভাজনকে তিনি মানুষের তৈরি বলে দেখতেন। ওপেনশ বাউলগান জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছেন।
গবেষক সাইমন জাকারিয়া জানিয়েছেন, সলোমন প্রায় তিন দশক ধরে লালনের গান, দর্শন ও সাধকদের জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন। পাণ্ডুলিপির পাশাপাশি সাধকদের কাছ থেকে সংগৃহীত গান ও ব্যাখ্যার ভিত্তিতে তৈরি হয় তাঁর কাজ। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটি লালনের গানকে ভাষার সীমানা পেরিয়ে বৈশ্বিকভাবে শোনার সুযোগ দিয়েছে।
ওপেনশের আলোচনায় ব্যাখ্যার সতর্কতাও রয়েছে। বাউল পরিচয়কে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন, এমনকি পরস্পরবিরোধীভাবে নির্মাণ করেছেন লেখক ও গবেষকেরা। তাই লালনের প্রেমকে বুঝতে তাঁর সাধনা, গুরুশিষ্যসম্পর্ক ও গানের নিজস্ব পরিভাষার প্রসঙ্গ প্রয়োজন। শুধু উৎসবের মঞ্চে জনপ্রিয় পঙ্ক্তি উচ্চারণে সেই জটিলতা ধরা পড়ে না। সাধকদের অভিজ্ঞতা ও গানের প্রামাণ্য পাঠ সংরক্ষণও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বোঝার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
মানুষের প্রতি সহমর্মিতা বাড়লে সামাজিক সম্পর্ক বদলাতে পারে কি না, তার পরীক্ষামূলক প্রমাণও রয়েছে। আবু সিদ্দিক, মাইকেল ভ্লাসোপুলোস ও ইভ জেনুর গবেষণায় বাংলাদেশের ১২১টি গ্রামের ৩ হাজার ৩০০’র বেশি পরিবার অংশ নেয়। সাঁওতালদের জীবন নিয়ে সহমর্মিতা জাগানো প্রামাণ্যচিত্র দেখানোর পর সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের সংখ্যালঘুদের প্রতি সহযোগিতামূলক আচরণ বাড়ার প্রমাণ পান তাঁরা। গবেষণাটি ২০২৬ সালে দ্য কোয়ার্টারলি জার্নাল অব ইকোনমিকসে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাটি দেখায়, মানুষের জীবনকে কাছে থেকে জানার সাংস্কৃতিক মাধ্যম আচরণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তাই বর্তমান সমাজের সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক মনোভাব দূর করতে লালনের মানবপ্রেম, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ভাবাদর্শের চর্চাও ভূমিকা রাখতে খুবই প্রাসঙ্গিক।
এই আলোকে ছেঁউড়িয়ার সমাবেশকে ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কথা শোনা, একসঙ্গে বসা এবং মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। স্থানীয় সাংস্কৃতিক চর্চায় এমন অংশগ্রহণ নিয়মিত হলে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্রও বাড়তে পারে।
১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ছেঁউড়িয়ায় দেহত্যাগ করেন লালন। তাঁর তিরোধানের ১৩৬ বছর পরও সাধুর হাটে ফিরে আসে মানুষের পরিচয় ও মর্যাদার প্রশ্ন। গবেষণাগুলোতে পাওয়া বিভেদবিরোধী দর্শনকে দৈনন্দিন আচরণে নেওয়ার মধ্যেই রয়েছে এই আয়োজনের বৃহত্তর সম্ভাবনা। প্রতিবেশীর বিশ্বাস, নারী বা প্রান্তিক মানুষের পরিচয় যেন অবমাননার কারণ না হয়—লালনের সমাজভাবনা বর্তমানের সামনে সেই মানবিক দায়ই হাজির করে।