স্বাস্থ্য বিভাগের সবশেষ (৭ সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে জেলা হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৮৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে ৩৫ জন, নাজিরপুরে ১৩ জন, নেছারাবাদে ১২ জন, কাউখালীতে ৫ জন, ভান্ডারিয়ায় ১৫ জন এবং মঠবাড়িয়ায় ৫ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে জিয়ানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কোনো ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেই। চিকিৎসা শেষে ইতিমধ্যে ১ হাজার ৮৭৯ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
চলতি বছরে হাসপাতাল ভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৮৫৪ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে। এছাড়া ভান্ডারিয়ায় ৩৬৩, নেছারাবাদে ৩১৯, নাজিরপুরে ১৩৪, কাউখালীতে ১২৫ এবং মঠবাড়িয়ায় ৮৪ জন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলো থেকে।
রোগীর সংখ্যা বাড়ায় পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে দেখা দিয়েছে তীব্র শয্যা ও জায়গা সংকট। পর্যাপ্ত বেড না থাকায় বাধ্য হয়ে সাধারণ রোগীদের কাছাকাছি মেঝেতে রেখেই ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যা নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মাঝে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী মারুফা আক্তার বলেন, ৩-৪ দিন ধরে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছি। তীব্র শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তি ও বমি ভাব কমছে না। ওষুধ দেওয়া হলেও এখনো সুস্থ বোধ করছি না। হাসপাতালে রোগীর যে চাপ, তাতে ঠিকমতো থাকার জায়গা ও সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চিকিৎসাধীন অনেক ডেঙ্গু রোগী নিয়ম মেনে মশারি ব্যবহার করছেন না। হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা এক নার্স জানান, বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও অনেক রোগী সচেতনতার অভাবে মশারি খুলে রাখেন।
তবে হাসপাতালের সামগ্রিক চিকিৎসা সেবা প্রসঙ্গে পিরোজপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. নিজাম উদ্দিন জানান, "আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি থাকেন, বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ৩৫ জন। ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় এনএস-১ কিট, ওষুধপত্র ও আনুষঙ্গিক চিকিৎসা সামগ্রী পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুদ রয়েছে। চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি নেই; ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সার্বক্ষণিক নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।"
এদিকে পিরোজপুরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যালোচনায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR)-এর একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালায়। পিরোজপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান জানান, আইইডিসিআরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পিরোজপুরে প্রচুর সুপারি ও নারিকেল গাছ থাকায় কাটা গাছের গোড়ায় জমে থাকা পানি, নারিকেলের খোসা, ভবনের ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, স্থানীয় 'বের' (নালা) এবং বিভিন্ন নার্সারির টবে জমে থাকা পানিতে প্রচুর পরিমাণে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে।
সিভিল সার্জন আরও জানান, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত ওষুধ, সেলাইন ও বিনামূল্যে পরীক্ষার অ্যান্টিজেন কিট প্রস্তুত রয়েছে এবং সরকারিভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া নিশ্চিত করা হচ্ছে।
স্থানীয় পৌরসভা ও জেলা পরিষদ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করার কথা জানিয়েছে। পিরোজপুর পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মেহেদী হাসান বলেন, মশার লার্ভা ধ্বংস করতে শহরের নালা ও ড্রেনগুলোতে নিয়মিত স্প্রে ছিটানো হচ্ছে এবং সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে। পিরোজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন জানান, বিভিন্ন পুকুর, ডোবা ও নালা পরিষ্কারের পাশাপাশি জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে সাধারণ জনগণকে নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ করা এবং দিন বা রাতে ঘুমানোর সময় আবশ্যিকভাবে মশারি ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে।