সুরাইয়ার সঙ্গে ঘটা এমন ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এতে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের একটি বড় ঘাটতি ফুটে উঠেছে—তা হলো, নারী ক্রিকেটারদের আয়, চুক্তি ও খেলায় ফেরার পথ সুগম করার মতো নির্দিষ্ট কোনো মাতৃত্বকালীন নীতিমালার অভাব।
২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশের হয়ে ১৬টি ওয়ানডে ও ৫৪টি টি-টোয়েন্টি খেলা সাবেক ওপেনার সানজিদা ইসলাম ময়না ২০২০ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার মিম মোসাদ্দেককে বিয়ে করেন। ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঘরোয়া ক্রিকেট চালিয়ে যাওয়ার পর ২০২৫ সালে তিনি সন্তানের মা হন। এরপর সন্তানকে লালন-পালনের জন্য খেলায় বিরতি নেওয়ার পর আর ফিরতে পারেননি।
সানজিদার মতে, বিয়ে ও মাতৃত্ব নিয়ে কর্তাব্যক্তি এবং নির্বাচকদের পুরোনো দৃষ্টিভঙ্গিই নারী ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ারকে প্রভাবিত করে। ক্যারিয়ার দীর্ঘ করতে অনেক নারী ক্রিকেটার যেমন বিয়ে পিছিয়ে দেন, তেমনি কেউ কেউ বিয়ের বিষয়টি আড়াল করেও রাখেন।
সানজিদা বলেন, ‘বিসিবির সিস্টেমে বিবাহিত খেলোয়াড়দের প্রতি এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। কর্মকর্তা ও নির্বাচকরা ধরে নেন কোনো নারী খেলোয়াড় বিয়ে করলে বা মা হলে তিনি আর বেশি দিন খেলতে পারবেন না। ফলে তার ওপর আর কোনো বিনিয়োগ করতে চান না তারা, যাকে সময়ের অপচয় মনে করেন।’
তার মতে, সঠিক মাতৃত্বকালীন সহায়তা পেলে বিয়ের পরও নারী ক্রিকেটাররা দীর্ঘদিন খেলা চালিয়ে যেতে পারতেন। সম্প্রতি নারী বিভাগীয় কোচের পদে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন সানজিদা, তবে অদৃশ্য কারণে তাকে বেছে নেওয়া হয়নি।
সুরাইয়ার অভিজ্ঞতাতেও সেই একই দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ স্পষ্ট, ‘একজন খেলোয়াড় বিয়ে করলে বা বয়স কিছুটা বাড়লে সবাই ধরে নেয় তিনি আর খেলবেন না। আর সন্তান হলে তো মাঠে ফেরার প্রশ্নই আসে না।’
বোর্ডের এই নীরবতা তার খেলার ইচ্ছাকেও দমিয়ে দিয়েছে বলে জানান জাতীয় দলের সাবেক পেসার, ‘বোর্ড যদি ইতিবাচক সাড়া দিত, তবে আমার ফেরার ইচ্ছে ৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০০ শতাংশে পৌঁছে যেত।’
স্বামীর উৎসাহে ছুটির আবেদন করলেও সুরাইয়া অনুভব করেছেন, বোর্ড তাকে মূল্যায়ন করেনি। ২০২৫ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার বিভাগ নারী ক্রিকেট লিগে গুলশান ইউথ ক্লাবের হয়ে তিনি শেষ ম্যাচ খেলেছেন।
সন্তান ও ক্রিকেট—দুই দিক সামলাতে গিয়ে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার ও আন্তর্জাতিক আম্পায়ার সাথিরা জাকির জেসির, ‘আমি যখন বিবাহিত অবস্থায় জাতীয় দলের সহ-অধিনায়ক ছিলাম, তখনও মনে হতো হয়তো বেশি দিন খেলতে পারব না। মা হওয়ার পরও খেলা চালিয়ে গেছি, তবে কাজটা মোটেই সহজ ছিল না।’
‘ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়ে এখনও অনেকে সন্তান নেওয়ার সাহস পান না,’ উল্লেখ করে জেসি আরও যোগ করেন, ‘আজ আমি যে জায়গায় এসেছি, সেখান থেকে দ্বিতীয়বার সন্তান নেওয়ার কথা ভাবলেও দুবার চিন্তা করতে হয়। কারণ আমি জানি না বিসিবি সে সময় আমাকে সমর্থন দেবে কি না, কিংবা আম্পায়ারিংয়ের এই পর্যায়ে আবার ফিরতে দেবে কি না।’
বিশ্বের অন্যান্য দেশের চিত্র
গত ২২ জুন নারী ক্রিকেটারদের জন্য গর্ভধারণ-পরবর্তী খেলায় ফেরার চালু করে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। এই প্রক্রিয়ায় রিভার্স প্রসেসের ছয়টি স্তর রয়েছে—প্রস্তুতি, মূল্যায়ন, পুনরুদ্ধার, ফিটনেস, প্রত্যাবর্তন এবং পারফেকশন । এতে শারীরিক সুস্থতা অর্জন, চিকিৎসকের পরামর্শ, ধাপে ধাপে অনুশীলন এবং তদারকির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই নির্দেশিকাটি সদস্য বোর্ডগুলোকে নিজস্ব নীতি তৈরিতে সাহায্য করলেও বেতনের নিশ্চয়তা সরাসরি দেয় না।
অন্যদিকে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট তাদের চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারদের বেতনের সুযোগসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করে। ২০২১ সালে পাকিস্তানও ‘প্যারেন্টাল সাপোর্ট পলিসি’ চালু করেছে। এর এক বছর পর, সন্তান জন্মের মাত্র ছয় মাসের মাথায় শিশু ও একজন সহায়ক কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিসমাহ মারুফ।
অস্ট্রেলিয়া ও চীনে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটার এবং বর্তমানে কাতার নারী ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ ফাতেমা তুজ জোহরা জানান, ব্যবধানটা চোখে পড়ার মতো। অস্ট্রেলিয়ায় মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় পুরো বেতন দেওয়া হয়। পাশাপাশি বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা সেবা এবং খেলার উপযুক্ত কি না—তার ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে জাতীয় দলে সুযোগ পেলে খেলোয়াড়রা কেবল নিজেদের জন্য নয়, পুরো পরিবারের ভরসাস্থল হয়ে ওঠেন। তাই গর্ভধারণের কথা ভাবলে একজন ক্রিকেটারকে দশবার চিন্তা করতে হয়।’
‘এই অনিশ্চয়তার কারণেই আমাদের নারী খেলোয়াড়রা দেরিতে বিয়ে করেন... খেলোয়াড় হিসেবে সক্রিয় থাকাকালীন তারা পারিবারিক জীবন বা মাতৃত্ব নিয়ে দূরদর্শী চিন্তা করতে পারেন না। কারণ আমাদের দেশে কোনো নিরাপত্তা নেই। অর্থ বা সামাজিকভাবে নারীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে অন্য দেশের তুলনায় আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে।’
বিসিবি যা বলছে
বিসিবির নারী উইংয়ের প্রধান রফিকুল ইসলাম বাবু জানান, বোর্ড আইসিসির নীতি অনুসরণ করবে, ‘ভবিষ্যতে কেউ অন্তঃসত্ত্বা হলে বা মাতৃত্বকালীন ছুটি চাইলে অবশ্যই দেওয়া হবে। এ বিষয়ে আমরা আইসিসির গাইডলাইন মেনে চলব’।
বিসিবিতে এমন কোনো নীতিমালা কেন তৈরি হলো না তা তার জানা নেই বলে জানান রফিকুল। সুরাইয়ার বকেয়া বেতন ও চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিবির এই পরিচালক জানান, তার বকেয়া দ্রুত মিটিয়ে দেওয়া হবে এবং সব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিজামউদ্দিন চৌধুরী আনুষ্ঠানিক মাতৃত্বকালীন নীতিমালার অভাব স্বীকার করে বলেন, ‘বিষয়গুলো এখন ঘটনাভেদে সামাল দেওয়া হচ্ছে।’
এই বিষয়ে দ্রুত নীতিমালা চালু হবে বলেও জানান তিনি, ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা সংক্রান্ত পলিসি ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকি নীতিগুলোও আমরা যত দ্রুত সম্ভব চালু করব।’
পরিস্থিতি যাই হোক, বিসিবি আইসিসির গাইডলাইন মানার প্রতিশ্রুতি এবং বকেয়া মেটানোর আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট মাতৃত্বকালীন নীতিমালা নেই। এই ছুটির সময় বেতন পাওয়া যাবে কি না, চুক্তির নিরাপত্তা কতটুকু এবং মাঠে ফেরার সময় খেলোয়াড়রা কেমন সহায়তা পাবেন—এসব বিষয় নীতিমালায় পরিষ্কার থাকা জরুরি।
যত দিন না এমন নীতি চালু হচ্ছে, তত দিন দেশের নারী ক্রিকেটারদের এই সংশয় নিয়েই খেলতে হবে—মাতৃত্ব এবং দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ার কি আসলেই পাশাপাশি চলতে পারে?