ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনী যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয় বলে স্বীকার করে জেনারেল স্যার গুইন জেনকিন্স কার্যত সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান অবস্থার সমালোচনা করা সর্বোচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বে থাকা সামরিক কর্মকর্তা হয়ে উঠলেন। এতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের ওপর চাপ আরও বাড়ল বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ট্রাম্প ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত সহযোগিতা না দেয়ার অভিযোগ তুলে যুক্তরাজ্যকে ‘নিজেদের তেল নিজেরাই জোগাড় করতে’ বলেন। মূলত ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যদিও পরে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, তিনি শিগগিরই যুদ্ধ শেষ করতে পারেন। ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে আমরা (ইরান থেকে) সরে যাব, কারণ আমাদের থাকার আর দরকার নেই’। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও যুক্তরাজ্যের সমালোচনা করেছেন। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘বিশাল, ভয়ঙ্কর নেভি’ যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তায় জাহাজ পাঠায়নি।
এমন অবস্থায় গত সোমবার সুইডিশ পত্রিকা স্ভেনস্কা ডাগব্লাডেট-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে জেনারেল স্যার গুইন বলেন, প্রয়োজন হলে নৌবাহিনী যুদ্ধ করতে পারবে। তিনি বলেন, ‘যদি আমাদের যুদ্ধ করতে বলা হয়, অবশ্যই আমরা করব’। তবে সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আমাদের যতটা প্রস্তুত থাকা উচিত, ততটা কি আছি? আমার মনে হয় না। আমাদের এখনও অনেক কাজ বাকি।’
ইরানের হামলার শঙ্কা: সাইপ্রাসে ডেস্ট্রয়ার ও হেলিকপ্টার পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য
ইরানের হামলার শঙ্কা: সাইপ্রাসে ডেস্ট্রয়ার ও হেলিকপ্টার পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য
৩ মার্চ ২০২৬
ব্রিটিশ নৌবাহিনী প্রধানের কাছ থেকে এই মন্তব্য এসেছে এমন সময়ে, যখন ব্রিটিশ সরকারের প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। আগামী এক দশকের সামরিক ব্যয়ের রূপরেখা দিতে এই পরিকল্পনা করার কথা। সামরিক কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে জিডিপির ৩ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ইরান সংঘাত শুরুর সময় ব্রিটেনের ছয়টি ডেস্ট্রয়ারের মধ্যে চারটি মেরামতের পর্যায়ে থাকার কারণে অচল ছিল। এ সময় সাইপ্রাসে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের ঘাঁটি রক্ষা না করার অভিযোগও ওঠে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। ইরানি ড্রোন হামলার দুই সপ্তাহ পর এইচএমএস ড্রাগন নামের একটি ডেস্ট্রয়ার সেখানে পাঠানো হয়।
এমনকি ন্যাটোর দায়িত্ব পালনে উত্তর আটলান্টিকে টহল দিতে জার্মানি থেকে যুদ্ধজাহাজও ধার নিতে হয়েছে যুক্তরাজ্যকে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাতে যে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করছে, সেগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। যুক্তরাজ্যে ইরানের রাষ্ট্রদূত সাইয়্যেদ আলি মুসাভি বলেন, ‘সব ধরনের অপশন বিবেচনায় নেয়া হবে।’
বর্তমানে উপসাগরীয় সংকট মোকাবিলায় প্রায় ২ হাজার ব্রিটিশ সেনা প্রস্তুত রয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে। এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের বিশেষ সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি করেছে। ট্রাম্প এর আগে অভিযোগ করেন, ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটি ব্যবহার করতে বাধা দেয়ায় তিনি হতাশ।
এমনকি সম্প্রতি তিনি ব্রিটিশ বিমানবাহী রণতরীকে ‘খেলনা’ বলেও ব্যঙ্গ করেন। মূলত ইরান যুদ্ধ ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েন বাড়িয়েছে। ইতালি সিসিলিতে মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়নি, আর স্পেন তার আকাশসীমা মার্কিন সামরিক বিমানের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে।
এমন অবস্থায় মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প অন্যান্য দেশকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সহায়তার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘যেসব দেশ জ্বালানি পাচ্ছে না, যেমন যুক্তরাজ্য, তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিনতে পারে এবং সাহস দেখিয়ে নিজেরাই প্রণালিতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তোমাদের নিজেদের জন্য লড়াই করতে শিখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্র আর সাহায্য করবে না... নিজের তেল নিজেরাই জোগাড় করো’। হেগসেথও একই সুরে বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও এই মিশনে অংশ নিতে প্রস্তুত থাকতে হবে।
ট্রাম্পের এসব মন্তব্যের পর তেলের দাম ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৮ ডলারে পৌঁছায়। এমন অবস্থায় অর্থনীতিবিদরা বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি বাড়ার সতর্কতা দিয়েছেন। বিনিয়োগ ব্যাংক পিল হান্ট বলেছে, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বড় অর্থনীতির দেশগুলো ‘মুদ্রাস্ফীতিজনিত মন্দার’ মুখে পড়তে পারে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের বিশ্লেষকরা বলেছেন, ইরান-সমর্থিত হুথিরা যদি লোহিত সাগরের প্রবেশপথ ‘বাব আল-মান্দেব’ বন্ধ করতে সক্ষম হয়, তবে তা বৈশ্বিক মন্দার ঝুঁকি আরও বাড়াবে।
সোমবার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে বলেছে, গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কারণে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি জ্বালানি সংকটে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
এদিকে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ওষুধের সংকটও বাড়ছে। এনএইচএস ইংল্যান্ডের প্রধান স্যার জিম ম্যাকি জানিয়েছেন, সিরিঞ্জ, গ্লাভস ও স্যালাইন ব্যাগের মতো সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে তারা ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’।