এখন কাতারিরা তাদের ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লিখতে যাচ্ছে। তারা ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে—তবে এবার আয়োজক হিসেবে নয়, বরং মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের পারফরম্যান্সের মাধ্যমে। অভিজ্ঞ ও তরুণ প্রতিভার সমন্বয়ে গড়া এই দলটি এখন এটি প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর যে, ২০২২ সালের সেই অংশগ্রহণ ছিল ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে তাদের এক দীর্ঘস্থায়ী যাত্রার সূচনা মাত্র।
প্রধান কোচ: হুলেন লোপেতেগি
২০২৫ সালের মে মাসে হুলেন লোপেতেগি ‘দ্য ম্যারুনস’-এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি কাতারকে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট এনে দেন—যা বাছাইপর্বের নিয়মিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাতারের প্রথমবার যোগ্যতা অর্জন। কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবেই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যেখানে তার শীর্ষ পর্যায়ের ক্লাব এবং জাতীয় দল পরিচালনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হয়েছে।
লোপেতেগির ক্যারিয়ার বেশ সমৃদ্ধ। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি স্পেন জাতীয় দলের কোচ ছিলেন, যেখানে ২০১৮ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে তার দল অপরাজিত ছিল। এরপর তিনি রিয়াল মাদ্রিদ এবং সেভিয়ার দায়িত্ব পালন করেন। সেভিয়ার হয়ে তিনি ২০২০ সালে উয়েফা ইউরোপা লিগ জয় করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রিমিয়ার লিগের দল উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্স এবং ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডের কোচের দায়িত্বও পালন করেছেন।
সাবেক এই গোলরক্ষক রিয়াল মাদ্রিদের একাডেমি থেকে উঠে এসেছেন এবং বার্সেলোনা ও রায়ো ভায়োকানোর হয়ে খেলেছেন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি স্পেন জাতীয় দলের হয়েও মাঠে নেমেছিলেন। লোপেতেগি তার শান্ত স্বভাব ও নিখুঁত কৌশলগত বিশ্লেষণের জন্য পরিচিত, যার প্রতিফলন এখন কাতারের খেলার ধরনেও দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বকাপে কাতারের সূচি
১৩ জুন: কাতার বনাম সুইজারল্যান্ড — সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়াম
১৮ জুন: কানাডা বনাম কাতার — বিসি প্লেস ভ্যাঙ্কুভার
২৪ জুন: বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা বনাম কাতার — সিয়াটল স্টেডিয়াম
বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: এএফসি
সেরা সাফল্য: গ্রুপ পর্ব (২০২২)
সর্বশেষ বিশ্বকাপ: ২০২২
প্রথম বিশ্বকাপ: ২০২২
অংশগ্রহণ: ২ বার (২০২২, ২০২৬)
টানা অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা: ২ বার
বিশ্বকাপ আয়োজন: ২০২২
সামগ্রিক রেকর্ড: ম্যাচ ৩, জয় ০, ড্র ০, হার ৩, গোল করেছে ১, গোল খেয়েছে ৭।
ফিফা র্যাংকিং: ৫৫তম
কাতারের প্রথম বিশ্বকাপ
আল বাইত স্টেডিয়ামে যখন উদ্বোধনী বাঁশি বেজেছিল, তখন গ্যালারিতে ছিল ৬৭,০০০-এর বেশি দর্শক। সেটি ছিল কাতারের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত; নিজেদের মাটিতে সমর্থকদের ভালোবাসায় ঘেরা এক উৎসবমুখর পরিবেশে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলা—যে দিনটির স্বপ্ন দেশটি বছরের পর বছর ধরে দেখে আসছিল।
ফেলিক্স সানচেজের অধীনে কাতার ২০২২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ইকুয়েডরের মুখোমুখি হয়। স্নায়ুচাপের সেই ম্যাচে তারা ২-০ ব্যবধানে পরাজিত হয়। দ্বিতীয় ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষে আল থুমামা স্টেডিয়ামে তারা আরও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেললেও ৩-১ ব্যবধানে হেরে যায়। শেষ ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে একটি সম্মানজনক সমাপ্তির লক্ষ্য থাকলেও ইউরোপীয় দলটির অভিজ্ঞতার কাছে কাতার ২-০ গোলে পরাজিত হয়।
যদিও তাদের অভিষেক আসর কোনো পয়েন্ট ছাড়াই গ্রুপ পর্বে শেষ হয়েছিল, কিন্তু কাতার ফলাফলের চেয়েও দামি কিছু অর্জন করেছিল: তিন মহাদেশের তিনটি ভিন্ন ঘরানার ফুটবলের বিরুদ্ধে খেলার অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতাই তাদের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে, যার ফলে চার বছর পর তারা নিজেদের যোগ্যতায় ২০২৬ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে।
বিশ্বকাপে কাতারের গোলদাতা
মোহাম্মদ মুন্তারি কাতার ফুটবল ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করে নিয়েছেন দেশের হয়ে বিশ্বকাপের প্রথম গোলটি করে। ২০২২ সালে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচের ৭৮ মিনিটে ইসমাইল মোহাম্মদের ক্রস থেকে এক দুর্দান্ত হেডারে তিনি এই গোলটি করেন। যদিও ম্যাচটি কাতার হেরেছিল, কিন্তু বিশ্বমঞ্চে কাতারের খাতা খোলার সেই মুহূর্তটি ছিল এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়
আবদেলকরিম হাসান, বুয়ালেম খুখি এবং আকরাম আফিফ—এই ত্রয়ী কাতারের একমাত্র বিশ্বকাপ আসরে প্রতিটি ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন। ইকুয়েডর, সেনেগাল এবং নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তিনটি ম্যাচেই পুরো ২৭০ মিনিট মাঠে খেলেছেন তারা।