বিশ্বকাপজয়ী ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের অর্ধেক খেলোয়াড়ের বয়স ২৬ বছরের কম। ফলে চার বছর পর নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য ২০৩০ বিশ্বকাপে তারা আরও পরিণত, অভিজ্ঞ এবং শক্তিশালী হয়ে মাঠে নামবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ইয়ামাল-কুবারসিদের হাত ধরে নতুন যুগ
স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি এখন তাদের তরুণ প্রজন্ম। ১৯ বছর বয়সী লামিনে ইয়ামাল ইতোমধ্যেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হয়েছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেই ইতিহাস গড়েছেন তিনি। পেলের (১৯৫৮) ও ইতালির জিউসেপ্পে বার্গোমির (১৯৮২) পর বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার ইয়ামাল।
অন্যদিকে মাত্র ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার পাও কুবারসি পুরো বিশ্বকাপে এক মিনিটও মাঠের বাইরে যাননি। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন টুর্নামেন্টের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার।
২০৩০ বিশ্বকাপের সময় ইয়ামালের বয়স হবে মাত্র ২২, আর কুবারসির ২৩। অর্থাৎ দুজনই তখন ক্যারিয়ারের আরও পরিণত পর্যায়ে থাকবেন। এছাড়া পেদ্রি (২৩), গাভি (২১) এবং নিকো উইলিয়ামস (২৪)- এই তিনজনও আগামী বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা সময়েই খেলবেন।
অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের আদর্শ মিশেল
শুধু তরুণদের ওপর নির্ভর করেনি স্পেন। দলের মেরুদণ্ডে ছিলেন অভিজ্ঞ ফুটবলাররাও। ব্যালন ডি'অরজয়ী রদ্রি, ফ্যাবিয়ান রুইজ, মিকেল ওইয়ারজাবাল, মেরিনো, লাপোর্তে কিংবা গোলরক্ষক উনাই সিমন- এই অভিজ্ঞদের নেতৃত্বেই ভারসাম্যপূর্ণ একটি দল তৈরি হয়েছে।
এই মিশ্রণই লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেনকে টানা ৩৮ ম্যাচ অপরাজিত রেখেছে। জাতীয় দলের ইতিহাসে যা নতুন রেকর্ড। এর মধ্যে তারা জিতেছে ২০২৩ নেশনস লিগ, ২০২৪ ইউরো এবং সর্বশেষ ২০২৬ বিশ্বকাপ।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সফলতা
স্পেনের বর্তমান সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের। ২০১৩ সাল থেকে স্পেনের বয়সভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, অনূর্ধ্ব-২১ ইউরো এবং অলিম্পিক- সব জায়গাতেই এই প্রজন্মের খেলোয়াড়দের গড়ে তুলেছেন।
ফলে জাতীয় দলের দায়িত্ব পাওয়ার পর নতুন করে দল গড়তে হয়নি। যাদের তিনি বয়সভিত্তিক দলে তৈরি করেছিলেন, তাদের নিয়েই বিশ্বসেরা দল বানিয়েছেন।
বিশ্বকাপজয়ী ২৬ জনের মধ্যে ১৬ জনই ছিলেন ২০২৪ ইউরোজয়ী দলের সদস্য। ধারাবাহিকতা বজায় রেখেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার যে কৌশল স্পেন অনুসরণ করেছে, সেটিই এখন অন্য দেশগুলোর জন্য অনুসরণীয় মডেল হয়ে উঠেছে।
সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
অবশ্য সবকিছুই নিখুঁত নয়। ২০৩০ বিশ্বকাপে রদ্রি, ফ্যাবিয়ান রুইজ, মিকেল মেরিনো, আয়মেরিক লাপোর্তে, ওইয়ারজাবাল এবং উনাই সিমনের বয়স ৩৩ থেকে ৩৬ বছরের মধ্যে থাকবে। তাই আগামী চার বছরে এই জায়গাগুলোতে নতুন মুখ তৈরি করাই হবে স্পেনের সবচেয়ে বড় কাজ।
তবে বর্তমান ফুটবলে খেলোয়াড়দের দীর্ঘ ক্যারিয়ার বিবেচনায় এই অভিজ্ঞরাও তখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
স্পেনকে হারানোর সমীকরণ খুঁজছে প্রতিদ্বন্দ্বীরা
এই বিশ্বকাপে স্পেনের আধিপত্য ছিল প্রায় নিখুঁত। তারা ছিল সবচেয়ে বেশি বল দখল, সবচেয়ে বেশি সফল পাস এবং সবচেয়ে বেশি শট নেওয়া দল। তবে পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়ংকর ছিল তাদের বল ছাড়া খেলার কৌশল।
প্রতিপক্ষকে উঁচুতে চাপ দিয়ে দ্রুত বল কেড়ে নেওয়া, মাঝমাঠে আধিপত্য এবং প্রতিপক্ষকে ভুল করতে বাধ্য করার কৌশলে পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করেছে স্পেন। আট ম্যাচে সাতটিতেই তারা ক্লিন শিট রেখেছে, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে সর্বনিম্ন গোল হজমের নতুন রেকর্ড।
ফাইনালে আর্জেন্টিনা পুরো ৯০ মিনিটে লক্ষ্যভেদী একটি শটও নিতে পারেনি। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপ ফাইনালে এমন ঘটনা আর ঘটেনি। সেমিফাইনালে ফ্রান্সও স্পেনের বিপক্ষে কার্যত অসহায় ছিল। এমবাপে, ডেম্বেলে, বারকোলা ও অলিসের মতো তারকাদের নিয়েও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি তারা।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের তরুণ দলও ভবিষ্যতের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেনের বিপক্ষে ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। ব্রাজিলের অবস্থাও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে নতুন প্রকল্প শুরু হলেও দল এখনও নিজেদের সেরা ছন্দ খুঁজে পায়নি। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এস্তেভাও, এন্দ্রিকদের ঘিরে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা থাকলেও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর বিপক্ষে ধারাবাহিক সাফল্য এখনও অধরা।
নতুন যুগের সূচনা?
২০২৬ বিশ্বকাপ জয় হয়তো স্পেনের জন্য কোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, বরং এক নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা। বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে গড়ে ওঠা প্রতিভাবান ফুটবলার, সুসংগঠিত পরিকল্পনা, অভিজ্ঞ ও তরুণদের ভারসাম্য এবং সুস্পষ্ট ফুটবল দর্শনের কারণে আগামী চার বছরের বিশ্ব ফুটবলেও স্পেনকে হারানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিজেদের মাটিতে ২০৩০ বিশ্বকাপ খেলবে লা রোহা। আর সেই মঞ্চে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতে নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেই পারে বর্তমান বিশ্বের সেরা দলটি।