সরজমিনে কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের চর বজরা গ্রামে খোঁজ মেলে মুকুল মিয়ার (৩৮) পরিবারের। প্রায় দশবার তিস্তা নদীর ভাঙনের শিকার এই পরিবারটি বর্তমানে চর বজরা টারীপাড়ায় ওয়াপদা বাঁধের নীচে আশ্রয় নিয়েছেন। এখন মাথা গোঁজার ঠাঁই ছাড়া তাদের কোন জমিজমা নেই। একমাত্র থাকার ঘরটির টিনের চাল ফুটো হয়ে গেছে। গড়মে আর বৃষ্টিতে কষ্টকরভাবে কাটছে তাদরে দিন। আগে দিনমজুরী করে সংসার চালাতো মুকুল মিয়া। গত দুই বছর পূর্বে হঠাৎ করেই তার শরীরে প্রচন্ড জ¦র ও চুলকানির পর খাবারের প্রতি অনিহা চলে আসে। এরপর গ্রাম্য চিকিৎসক দেখানোর পরও কোন উন্নতি হয়নি। অর্থের অভাবে গ্রামের বাইরে কোন ডাক্তার দেখানো সম্ভব হয় নাই। ক্রমান্বয়ে মুকুলের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। সে কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়। মানুষের সাথে হিংস্র আচরণ শুরু করে দেয়। পরিবারের লোকজনকেও সে মারধোর করতে থাকে। অবস্থা আরও সঙ্গীন হওয়ায় নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মুকুল মিয়ার দু’পায়ে লোহার শিকল বেঁধে দেয়া হয়েছে। এখন পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে সে।
পাশ্ববর্তী গ্রাম থেকে ভাইকে দেখতে আসা মুকুলের বোন শামসুন্নাহার বলেন, আমার ভাই মুকুল মিয়া দু’বছর ধরে বিছানা নিয়েছে। কর্ম করতে পারে না। ছেলেমেয়েরা খেতে পারে না, চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেছে। লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে। বড় মেয়েটার বিয়ের বয়স হয়েছে। ঘরে খাবার নাই, মেয়ের বিয়ে দিবে কিভাবে!
মাঝে মধ্যেই ছেলেকে দেখতে এসে আক্রমনের শিকার হন মুকুলের মা আকলিমা। তিনি জানান, মুকুল হিংস্র হয়ে গেলে ঘরের জিনিসপত্র ভেঙ্গে ফেলে। ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, মা সবাইকে মারধোর করে। গলা টিপে ধরে। ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। অপরিচিত লোকের উপর আক্রমন করে। সে আমার বুকের পাজর ও ঘাড় ভেঙ্গে ফেলার অবস্থা করেছে। আগুনে আমার হাত পুড়ে গেছে।
মুকুলের স্ত্রী কহিনুর বেগম (৩৪) জানান, আগে আমার স্বামী সুস্থ্য ছিল। আমরা ভালো ছিলাম। ৫জনের সংসার কোন রকম চলতো। এখন সে অসুস্থ্য তার চিকিৎসা করাতে পারছি না। তার অত্যাচারে পরিবারসহ গ্রামের মানুষ ভয়ে থাকে। ফলে দু’বছর ধরে তার পায়ে শিকল বেঁধে রাখা হয়েছে। আমার বড় মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। বেতন ও গাইডবুক কিনে দেয়ার সামর্থ না থাকায় তার পড়াশুনা বন্ধ হয়ে গেছে। কাজকর্ম সবসময় না থাকায় ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খাওয়াতে পারি না। এখন আমার খুব কষ্ট হয়েছে।
মুকুলের ছোট মেয়ে ৪র্থ শ্রেণির মীম জানায়, আমার বাবা আগে খুব ভালো ছিল। আমাদের খুব আদর করতো। এখন বাবার হাতে খেতে পারছি না। আমি জামা-কাপড় ঠিকমতো পাচ্ছি না। পড়ালেখা ঠিকমতো করতে পারছি না। আমার বাবা এখন বিছানায় পরে আছে। আমাদের উপর খুব অত্যাচার করে। তবু আমার বাবাকে আমরা ফেলে দেই নাই।
মুকুলের চাচাতো ভাই ফুলমিয়া জানান, পরিবারটি এতো অভাবী যে, একমাত্র ঘরটিও ঠিক করার মতো সামর্থ নাই। বৃষ্টি হলে ভাঙ্গা টিনের চাল গলিয়ে ঘরের ভিতর পানি পরে। থাকা যায় না। এই অবস্থা দেখে পলিথিন কিনে টিনের চালে ঢেকে দিয়েছি। বর্তমানে তাদের অবস্থা খুব খারাপ। স্ত্রী কাজ করলে মুখে ভাত যায়, নাহলে উপবাস! তাদের সহযোগিতা ও চিকিৎসা দরকার। ব্যবস্থা না করলে এরা না খেয়ে মারা পরবে। এছাড়াও মুকুলের ভালো চিকিৎসা দরকার। স্থানীয় গ্রাম্য কবিরাজি চিকিৎসা করে সে আরও অসুস্থ্য হয়ে পরেছে। এখন হিং¯্র হয়ে যাওয়ায় তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার এখন উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু এরা মুখে আহার যোগাতে পারে না। ডাক্তার দেখাবে কিভাবে!
উলিপুর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. লুৎফর রহমান জানান, মুকুল নামে যে ব্যক্তির তথ্য আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম, আমরা ওই এলাকায় আমাদের ইউনিয়ন সমাজকর্মীকে পাঠাবো, তার তদন্ত সাপেক্ষে আমরা দ্রুত সমাজসেবা নির্ধারিত যে সেবাগুলো আছে সেই সেবার আওতায় আনার চেষ্টা করবো।
এ ব্যাপারে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ, টি, এম, আরিফকে বারবার কল কলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।