উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী গোলনগর গ্রামে এখনো কয়েকটি পরিবার বাঁশ দিয়ে মাছ রাখার ঝুড়ি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারই কোনো না কোনোভাবে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। দুই শতাধিক কারিগর বাঁশের পণ্য তৈরিতে জড়িত থাকলেও বর্তমানে এ সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ৩০ জনে।
প্রায় ৩০ বছর ধরে বাঁশের পণ্য তৈরি করছেন কারিগর মাসুম মিয়া। তিনি বলেন, একসময় বাঁশের তৈরি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল। অনেক পরিবার এ কাজের আয় দিয়ে সংসার চালাত। কিন্তু প্লাস্টিকের ঝুড়ি ও ককশিটের বক্সের ব্যবহার বাড়ায় বাঁশের পণ্যের বাজার অনেকটাই কমে গেছে।
কারিগর বেনু মিয়া বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকেই তাঁদের পরিবার এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। আগে আশপাশের এলাকা থেকেই সহজে বাঁশ সংগ্রহ করা যেত। এখন স্থানীয়ভাবে বাঁশ পাওয়া যায় না। দূরের এলাকা থেকে বেশি দামে বাঁশ কিনে আনতে হয়। পণ্যের চাহিদাও আগের মতো নেই। তারপরও বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছেন তাঁরা। সরকারি সহায়তা পেলে এ শিল্পটি আরও ভালোভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে জানান তিনি।
কারিগরদের ভাষ্য, মুলি ও ওড়া বাঁশ দিয়ে মাছ রাখার ঝুড়ি তৈরি করা হয়। একসময় স্থানীয় বাঁশ দিয়েই প্রয়োজন মিটলেও এখন গাজীপুরের কাপাসিয়া এলাকা থেকে বাঁশ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন খরচসহ কাঁচামালের ব্যয় বেড়েছে।
তাঁরা জানান, আগে যে বাঁশ প্রায় ১৫০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটির দাম পড়ছে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত। একটি বড় মাছের ঝুড়ি তৈরি করতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লাগে। আকারভেদে এসব ঝুড়ি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তৈরি করা ঝুড়ি ঢাকার যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন মাছের আড়তে সরবরাহ করা হয়। মাছের ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা এসব ঝুড়ি ব্যবহার করেন।
এ শিল্পের সঙ্গে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও যুক্ত। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বাঁশ সংগ্রহ ও ঝুড়ির কাঠামো তৈরির কাজ করেন। অন্যদিকে নারীরা বাঁশ চিরে সরু ফালি তৈরি ও বুননের কাজে অংশ নেন। পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত শ্রমেই তৈরি হয় প্রতিটি পণ্য।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুর রশিদ বলেন, নব্বইয়ের দশকে গোলনগর এলাকায় শতাধিক কারিগর বাঁশের ঝুড়ি তৈরি করতেন। তখন এসব ঝুড়ি মাছ ও কাঁকড়া বিদেশে পাঠানোর কাজেও ব্যবহৃত হতো। ফলে চাহিদা ছিল ভালো এবং অনেক পরিবার এ ব্যবসার মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছিল। বর্তমানে প্লাস্টিকের ঝুড়ি ও ককশিটের বক্সের ব্যবহার বাড়ায় বাঁশের পণ্যের কদর কমেছে। পাশাপাশি বাঁশের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারিগর পেশা পরিবর্তন করেছেন। নতুন প্রজন্মও এ কাজে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গোলনগর এলাকায় প্রায় এক শতাব্দী ধরে বাঁশের পণ্য তৈরির ঐতিহ্য চলে আসছে। একসময় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন কারিগরের সংখ্যা দ্রুত কমছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী এ কুটিরশিল্পটি অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
সোনারগাঁ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ ধরনের কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারগুলোকে স্বাবলম্বী করতে সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় সহায়তার সুযোগ রয়েছে। প্রকৃত উপকারভোগীদের তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহায়তার আওতায় আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে। পাশাপাশি কারিগরদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলে এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী পেশা টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি তাঁদের জীবনমানও উন্নত করা সম্ভব।
কারিগর ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ এবং বাঁশজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে হারিয়ে যেতে বসা এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এতে একদিকে শত বছরের ঐতিহ্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে স্থানীয় নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও ধরে রাখা সম্ভব হবে।