রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা বলছেন, সন্ধ্যায় শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের বিক্রি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তাঁদের দাবি, অন্তত রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত রেস্তোরাঁ খোলা রাখার সুযোগ থাকতে হবে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগের নির্দেশনায় রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখার কথা উল্লেখ না থাকলেও মাঠপর্যায়ে তাঁরা নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়েছেন। অনেক সময় পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার লোকজন এসে রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড ও বাইরের আলোকসজ্জা বন্ধ করে দিতে চাপ দেয়। এমনকি রেস্তোরাঁর ভেতরে লাইট জ্বালিয়ে রাখলেও বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দেওয়া হয়। এতে রেস্তোরাঁ খোলা আছে কি না, সেটিই মানুষ বুঝতে পারে না। অন্যদিকে বিপণিবিতান সন্ধ্যা ৭টায় বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের চলাচলও কমে যায়। ফলে রেস্তোরাঁয় ক্রেতা কমে যায়। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায় আরও ধস নামবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টায় দোকানপাট বন্ধ করতে হলে রেস্তোরাঁ খাত ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ঈদের পর এমনিতেই আমাদের বিক্রি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। এর মধ্যে ব্যবসার সময় আরও সীমিত করা হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এভাবে চললে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, রেস্তোরাঁ ব্যবসার মূল সময়ই হচ্ছে সন্ধ্যার পর। মানুষ সাধারণত রাতে বাইরে খেতে আসে। তাই ব্যবসা সচল রাখতে অন্তত দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। এতে ব্যবসায়ীরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পেতেন।
সরকারি নির্দেশনায় রেস্তোরাঁর বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানান ইমরান হাসান। তিনি বলেন, রেস্তোরাঁ খাত এই নির্দেশনার আওতায় রাখা হয়েছে কি না, সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। বিষয়টি খোলাসা না থাকায় মাঠপর্যায়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। এমন অস্পষ্টতা থাকলে কিছু ক্ষেত্রে হয়রানি বা চাঁদাবাজির সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে। সরকার এ বিষয়ে দ্রুত স্পষ্ট নির্দেশনা দেবে বলে আমরা আশা করছি।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য নানা সংকটের মধ্যে রয়েছে। সরকার ভ্যাট-ট্যাক্স আদায় করবে, সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ সীমিত করে দিলে উদ্যোক্তারা রাজস্ব দেবেন কীভাবে, কর্মীদের বেতন দেবেন কীভাবে, আর নিজেদের ভরণপোষণই বা কীভাবে চালাবেন, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বেইলি রোডের নবাবী ভোজ রেস্তোরাঁর নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান চৌধুরী বিপু বলেন, সরকার মার্কেট বন্ধ রেখে রেস্তোরাঁ খোলা রাখার সুযোগ দিলেও বাস্তবে এতে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। কারণ মার্কেট বন্ধ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের চলাচল কমে যায়, ফলে রেস্তোরাঁয়ও ক্রেতা আসে না। শুরু থেকেই আমরা এই সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি এবং এখনো ভুক্তভোগী হয়েই আছি। আগেই আমাদের বিক্রি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে কার্যক্রম সীমিত করার পর সেই ক্ষতি বেড়ে এখন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছাবে। রেস্তোরাঁ ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ই হচ্ছে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত। এই সময় ব্যবসা করার সুযোগ না থাকলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
পুলিশি হয়রানির চেয়ে সাইনবোর্ড ও আলোকসজ্জা বন্ধ করে দেওয়াকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে কামরুল হাসান চৌধুরী বলেন, সাইনবোর্ড বন্ধ থাকলে মানুষ বুঝবেই না যে রেস্তোরাঁ খোলা আছে। এমনিতেই মার্কেট বন্ধ থাকায় মানুষের উপস্থিতি কম থাকে, তার ওপর সাইনবোর্ডও বন্ধ থাকলে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব আরও বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, আমাদের দাবি হলো দোকান ও রেস্তোরাঁ অন্তত রাত ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হোক। সকাল থেকে খোলা রাখার পরিবর্তে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত পরিচালনার অনুমতি দিলে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও টিকে থাকার সুযোগ পাবেন। কারণ সকালবেলায় ক্রেতা খুব একটা আসে না, মূল ক্রেতা আসে বিকেলের পর। রেস্তোরাঁয় মানুষের ভিড় মূলত বিকেলের পর থেকেই শুরু হয় এবং রাত পর্যন্ত থাকে। শুধু রেস্তোরাঁ নয়, অধিকাংশ মার্কেট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়।
মার্কেটভিত্তিক রেস্তোরাঁগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অধিকাংশ নতুন রেস্তোরাঁ গড়ে উঠছে শপিংমল ও মার্কেটকেন্দ্রিক। ফুড কোর্ট কিংবা বিপণিবিতানের ভেতরের রেস্তোরাঁগুলো একইসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাস্থ্যকর স্ট্রিট ফুডের দিকে ঝুঁকছে। এতে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে এবং চিকিৎসা ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাড্ডার আল কাদেরিয়া রেস্টুরেন্টের মালিক এবং বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির প্রথম যুগ্ম মহাসচিব মো. ফিরোজ আলম সুমন বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্ধ্যা ৭টার পর দোকানপাট বন্ধের সিদ্ধান্ত রেস্তোরাঁ খাতের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, এলপি গ্যাস ও ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এমনিতেই আমাদের মুনাফা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। শুধু আমার রেস্টুরেন্টেই প্রতি মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত গ্যাস খরচ হচ্ছে। এর মধ্যে আবার ব্যবসার সময় সীমিত হলে অনেক প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।
ফিরোজ আলম সুমন আরও বলেন, রেস্তোরাঁ ব্যবসার মূল সময়ই হচ্ছে সন্ধ্যার পর। বিশেষ করে ঢাকা শহরে মানুষ অফিস শেষ করে, কেনাকাটা শেষে কিংবা পরিবার নিয়ে রাতের দিকে রেস্তোরাঁয় আসে। মার্কেট ও দোকানপাট সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ হলে রাতের শহর অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। এতে মানুষের চলাচল কমে, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয় এবং সরাসরি রেস্তোরাঁর ক্রেতা কমে যায়। ফলে আমাদের বিক্রি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে হয়রানির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনায় রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখার কথা বলা না হলেও মাঠপর্যায়ে আমরা নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়ছি। অনেক সময় পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার লোকজন এসে রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড ও বাইরের আলোকসজ্জা বন্ধ করে দিতে চাপ দেয়। এমনকি লাইট জ্বালিয়ে রাখলে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকিও দেওয়া হয়। এতে রেস্তোরাঁ খোলা আছে কি না, সেটাই মানুষ বুঝতে পারে না। ব্যবসা চালু থাকার দৃশ্যমানতাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ঈদের আগে বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল হওয়ায় আমরা কোনো রকমে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও বোনাস দিতে পেরেছি। কিন্তু নতুন করে কঠোরতা আরোপ করা হলে অনেক রেস্তোরাঁর সামনে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া কোনো পথ থাকবে না।
এদিকে, আবারও দেশের সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। সোমবার (১ জুন) বিদ্যুৎ বিভাগ এ–সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে দেশের সব সিটি করপোরেশনের মেয়র ও প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠিয়েছে।
আদেশে বলা হয়েছে, এর আগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে শপিংমল, মার্কেট ও দোকান সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা রাখা এবং সব বিলবোর্ডের বাতি আবশ্যিকভাবে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান ও অনুষ্ঠেয় মেলা, বাণিজ্যমেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। তবে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সেই সময়সীমা রাত ১০টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ঈদ উপলক্ষে দেওয়া বিশেষ সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ায় ১ জুন থেকে আবারও আগের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। ফলে রাত ১০টার পরিবর্তে সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে কার্যক্রম শেষ করতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয় নিশ্চিত করতে সব ধরনের বিলবোর্ডের বাতি, দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত মেলা, বাণিজ্যমেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।