বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টায় বগুড়া জেলা জজ কোর্টের হলরুমে অনুষ্ঠিত জরুরি সাধারণ সভা শেষে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। সভায় আইনজীবীদের আন্দোলন, নতুন জেলা ও দায়রা জজের পদায়ন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি এবং বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ—সবকিছু মিলিয়ে পরবর্তী করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বার সমিতির সভাপতি আইনজীবী শেখ মো. রেজাউর রহমানের সভাপতিত্বে সভা পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী মো. রফিকুল ইসলাম।
সভা শেষে বার সভাপতি শেখ মো. রেজাউর রহমান বলেন, বিতর্কিত পদায়নের প্রতিবাদে গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে আইনজীবীরা আদালত বর্জন ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও আইনমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জেলা ও দায়রা জজকে প্রত্যাহারের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত এক মাস সময় প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কর্তৃপক্ষ কর্মসূচি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে জরুরি সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আদালত বর্জন কর্মসূচি এক মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
তবে এই স্থগিতাদেশকে আন্দোলন প্রত্যাহার হিসেবে দেখছেন না বার সভাপতি। তিনি বলেন, মূল সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়নি, শুধু এক মাসের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিষয়টির সুরাহা না হলে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বর্তমান জেলা ও দায়রা জজকে নিজের পক্ষ থেকেও বদলির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে, সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আব্দুল বাছেদ বলেন, বার ও বেঞ্চের মধ্যে সুসম্পর্ক না থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, আইন মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি একটি ইতিবাচক পর্যায়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আইনজীবীদের কর্মসূচি স্থগিতের সিদ্ধান্তকে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ উল্লেখ করে পিপি বলেন, এটি সরকারের প্রতি কোনো আলটিমেটাম নয়; বরং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ দিতে সাধারণ সভার পক্ষ থেকে সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত। রোববার থেকে জেলা জজ আদালতের সব কটি আদালতের পাশাপাশি পিপি ও স্পেশাল পিপি কার্যালয়ের কার্যক্রমও পুরোদমে শুরু হবে বলে জানান তিনি।
এজলাস থেকে খাসকামরা—আদালতপাড়ায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল
জেলা ও দায়রা জজের পদায়নকে কেন্দ্র করে গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে বগুড়া আদালতপাড়ায় উত্তেজনা ও আন্দোলনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর মধ্যে আইনজীবীদের আদালত বর্জনের কারণে নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে থাকে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মঙ্গলবার এজলাসে তীব্র হট্টগোলের মুখে নবনিযুক্ত বিচারককে বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত রেখে খাসকামরায় চলে যেতে হয়। ফলে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার শুনানি বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রতিদিন আদালতে বিচারপ্রার্থী মানুষের ভিড় থাকলেও কার্যক্রম স্বাভাবিক না থাকায় অনেককেই শুনানি ছাড়াই ফিরে যেতে হয়েছে। মামলার পরবর্তী তারিখ, জামিন, সাক্ষ্যগ্রহণসহ বিভিন্ন বিচারিক কার্যক্রমে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। দীর্ঘায়িত এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সরাসরি ভোগান্তিতে পড়েন দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিচারপ্রার্থী ও মামলার সংশ্লিষ্টরা।
বার সমিতির সিদ্ধান্তে আপাতত আদালতে স্বাভাবিক পরিবেশ ফেরার পথ তৈরি হলেও জেলা ও দায়রা জজের পদায়ন নিয়ে মূল বিরোধের স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি। এক মাসের স্থগিতাদেশের সময়ের মধ্যেই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করে বিষয়টির সমাধান হবে—এমন প্রত্যাশা করছেন আইনজীবীরা।
ফলে রোববার আদালতের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে শুরু হওয়ার পাশাপাশি এখন নজর থাকবে—নির্ধারিত এক মাসের মধ্যে পদায়ন-সংক্রান্ত জটিলতার কতটা সমাধান হয় এবং বগুড়া আদালতে বার ও বেঞ্চের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক কতটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, সেদিকে।