এই পরিস্থিতিতে জেলার খালগুলো পুনরুদ্ধারে বড় পরিসরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রাক্কলন অনুযায়ী, কক্সবাজারের ৫২টি খাল পুনঃখননের তালিকায় রয়েছে। এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২১৮ দশমিক ৯৮ কিলোমিটার। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৭১ কোটি ৮৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকার বেশি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়বে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে এবং প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার হবে।
কক্সবাজার সদর উপজেলায় শহরের পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পাঁচটি খাল- বারগোদা, বারিংগা, কাটাখালী, ঘাটিয়াখালী ও পাতিলা পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ পাতিলা খালকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। বর্ষায় খালটি সচল না থাকায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। এটি দখলমুক্ত করে পুনঃখনন করা গেলে জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রামু উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে বর্ষাকালে নিচু এলাকা তলিয়ে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে। এই পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য মিঠাছড়ি ও লামার খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে মিঠাছড়ি খালের কিছু অংশে কাজ শেষ হয়েছে এবং সেখানে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
উপকূলীয় মহেশখালী উপজেলায় খালগুলো স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। বরোদিয়া, ঘটিভাঙ্গা ও হামিদখালী খাল পুনঃখননের মাধ্যমে প্রায় আট কিলোমিটার জলপথ পুনরুদ্ধার হবে। এতে লবণচাষ ও মাছচাষে সুফল মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষিনির্ভর চকরিয়া উপজেলায় মগ খালসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খালগুলোর নাব্যতা ফিরলে জমিতে পানি জমে থাকার সমস্যা কমবে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়বে।
সীমান্তবর্তী টেকনাফ উপজেলায় ছোট খালগুলোই পানি নিষ্কাশনের প্রধান ভরসা। ছুড়ি ও আলীখালী খাল পুনঃখননের মাধ্যমে বসতবাড়ি ও কৃষিজমি জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাবে।
উখিয়া উপজেলায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর চাপ বেশি। পালংখালী ছড়া, মাছকারিয়া ও বালুখালী ছড়া খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া পেকুয়া উপজেলায় প্রায় ১৬ কিলোমিটার খাল পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং জলাবদ্ধতা কমবে। আর উপকূলীয় কুতুবদিয়া উপজেলায় খালগুলো সচল থাকলে জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকবে, কমবে লবণাক্ততার প্রভাব।
বর্তমান তালিকার বাইরে আরও ১৮টি খাল পুনঃখননের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৭০ কিলোমিটার। ইতোমধ্যে দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও উল্টাখালী রশিদ খালসহ কয়েকটি খালের কাজ শেষ হয়েছে, যেখানে পানি নিষ্কাশনে উন্নতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল পুনঃখননের পাশাপাশি দখল ও দূষণ বন্ধ না হলে এই উদ্যোগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উলাহ বলেন, টেকসই সুফল পেতে হলে খালগুলোকে দখলমুক্ত রাখা জরুরি।
সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’-এর সাধারণ সম্পাদক নাজিম বলেন, খাল খননের পর রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না হলে কয়েক বছরের মধ্যেই খালগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, প্রায় ২১৯ কিলোমিটার জলপথ পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ সম্ভাবনাময় হলেও এর বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও গতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। তার আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং জলাবদ্ধতা কমবে।