জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হালুয়াঘাট উপজেলার কৈচাপুর, ধারা, ধুরাইল, গাজিরভিটা, জুগলি ও স্বদেশি ইউনিয়ন পরিষদের ভবন মেরামত ও সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে প্রতিটি ইউপির বিপরীতে ১০ লাখ টাকা করে মোট ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৩০ জুনের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন দেখিয়ে জুন মাসেই পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
সরেজমিনে কৈচাপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভবনের বিভিন্ন স্থানে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। অথচ ভবন মেরামতের জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেখানে কোনো সংস্কারকাজের চিহ্ন নেই।
কৈচাপুর ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব সহকারী শফিকুর রহমান বলেন, ‘শুনেছি, বরাদ্দ এলে ভবনের সংস্কারকাজ করা হবে। কিন্তু এখনো কোনো বরাদ্দ আসেনি। দেড় বছর ধরে এখানে চাকরি করছি, এর মধ্যে কোনো ধরনের সংস্কারকাজ হয়নি।’
একই ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সংরক্ষিত সদস্য কুলসুম বেগম বলেন, ‘এখানে কাজ হলে ভবনটি ঝকঝকে হয়ে যেত। কিন্তু কাজ না হওয়ায় ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে।’
ধারা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের অবস্থাও নাজুক। ভবনের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়েছে। বৃষ্টি হলে কয়েকটি স্থানে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। বাথরুমগুলোর অবস্থাও খারাপ। এমনকি পানির কলগুলোও অকেজো।
ধারা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ভবনটি সংস্কার করা খুব জরুরি। শুনেছি সংস্কারের জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু জুন মাস চলে গেলেও কোনো সংস্কার হয়নি। এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলতেও পারছি না।’
সেবা নিতে আসা রুস্তমপুর গ্রামের সেলিনা বেগম বলেন, ‘কাজে এসে কোথাও বসতে পারছি না। বসার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই।’
ধুরাইল ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সংস্কারের জন্য ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে বলে শুনেছি। তবে অর্থবছরের সময়সীমা পার হয়ে গেলেও কোনো সংস্কার হয়নি। আমাদের ভবনে অনেক সংস্কারকাজ প্রয়োজন। এসব কাজ মূলত উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর করে থাকে। কাজ হওয়ার পর আমাদের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিল ওঠার কথা।’
একই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল হাসেম বলেন, ‘সংস্কারের জন্য কোনো বরাদ্দ আছে কি না, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। কোনো সংস্কারকাজ হতে দেখিনি।’
বরাদ্দের টাকা উত্তোলন করা হয়ে থাকলে বিষয়টি অন্যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কাজ না করে টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ সত্যি হলে খুবই অন্যায় করা হয়েছে।’
ধুরাইল ইউনিয়নের বাসিন্দা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির হালুয়াঘাট উপজেলা শাখার প্রধান সমন্বয়কারী আবু রায়হান বলেন, ‘আমার জানামতে কোনো ধরনের সংস্কারকাজ হয়নি। তাহলে টাকা তুলে আত্মসাৎ করা হয়েছে। কারা কেন করল, সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।’
অন্যদিকে গাজিরভিটা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সুব্রত দেবনাথ জানান, সম্প্রতি শেষ হওয়া অর্থবছরে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে কোনো সংস্কারকাজ হয়নি।
তবে টাকা উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হালুয়াঘাট উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ের অডিট অফিসার মঞ্জুরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘সব নিয়ম মেনেই ছয়টি ইউনিয়ন পরিষদের ভবন মেরামত ও সংরক্ষণ বাবদ ৬০ লাখ টাকা সোনালী ব্যাংক থেকে তোলা হয়েছে।’
কাজ না করেই টাকা উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) হালুয়াঘাট উপজেলা কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেন প্রথমে বলেন, ‘কাজ চলমান রয়েছে।’ পরে তিনি বলেন, ‘কাজ শুরু হবে। ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে।’
হালুয়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘সময় স্বল্পতার কারণে মন্ত্রণালয়ে লেখালেখি করে অফলাইনে আরএফকিউয়ের মাধ্যমে কাজ সম্পাদনের অনুমতি পেয়েছি। ছয়টি ভবনের মেরামতের কাজ তিনজন ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। আমরা জানি, কাজ শুরু হয়েছে। যেহেতু বলছেন কাজ শুরু হয়নি, তাহলে দ্রুত কাজ শুরুর জন্য ঠিকাদারকে চিঠি দেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সাইফুর রহমান বলেন, ‘অগ্রিম বিল উত্তোলন করলেও ওই অর্থবছরের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে যেহেতু আলোচনা উঠেছে, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ ঘটনায় বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন, কাজের বাস্তব অগ্রগতি এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারের প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা প্রয়োজন।