শনিবার (২৮ মার্চ) প্রথমবারের মতো ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী সরাসরি যুদ্ধে যুক্ত হয়ে ইসরায়েলের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এক বিবৃতিতে ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনী জানায়, তারা দক্ষিণ দখলকৃত ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর আগে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছিল, ইয়েমেন থেকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। হুতি বলেছে, লেবানন, ইরান, ইরাক ও ফিলিস্তিনে চলমান হামলার জবাব হিসেবেই তারা এই অভিযান চালিয়েছে। একই সঙ্গে বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ করে দেয়াও তাদের জন্য ‘সম্ভব’ বিকল্প বলে জানিয়েছে গোষ্ঠীটির তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা।
এদিকে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ’র ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট হামলায় অন্তত ৯ ইসরায়েলি সেনা আহত হয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, শুক্রবারের এসব হামলায় ২ ইসরায়েলি সেনা আহত হয়েছেন। শনিবার ভোরে আরেক দফা রকেট হামলায় ৭ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ২ জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। ইসরায়েলি বাহিনী বর্তমানে লেবাননের ভেতরে প্রায় ৭ কিলোমিটার পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে, তবে হিজবুল্লাহ পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এবং তাইবেহ এলাকায় চালিয়েছে অতর্কিত হামলা।
ইরানের হামলায় তেল আবিব ও আশপাশের এলাকায় ১১টি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। এতে হতাহতের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভবন, সড়ক ও গাড়ি। ইসরায়েলের জরুরি চিকিৎসা সংস্থা জানিয়েছে, এই হামলায় ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও দুইজন।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় ১০ জনের বেশি মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে ২৯ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। সর্বশেষ হামলায় ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ২৯টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়। এ হামলায় আহত ১৫ মার্কিন সেনার মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর। এর আগে একই ঘাঁটিতে আরও দুই দফা হামলায় ১৪ জন সেনা আহত হয়। রিয়াদ থেকে প্রায় ৯৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি সৌদি বিমানবাহিনী পরিচালনা করলেও সেখানে মার্কিন সেনারাও অবস্থান করছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় ধ্বংসাবশেষ পড়ে তিনটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, এতে ছয়জন আহত হন। খলিফা অর্থনৈতিক অঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় আগুনগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও একাধিক ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে, এতে রাডার ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যদিও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তবে বিমানবন্দরের একটি জ্বালানি ডিপোতে ভয়াবহ আগুন লাগে। এসব হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে কুয়েত।
এছাড়া ওমানের সালালাহ বন্দরে ড্রোন হামলায় এক বিদেশি শ্রমিক আহত হয়েছেন এবং একটি ক্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এদিকে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় বাহরাইনে সাইরেন বাজানো হয়েছে এবং নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, হুতিদের সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালের পথও কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দেশটির পরমাণু স্থাপনায় হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইসরায়েলকে ‘চড়া মূল্য’ দেয়ার হুঁশিয়ারি দেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ইরানের ইউরেনিয়াম উৎপাদন কেন্দ্র, ভারী পানির চুল্লি এবং ইসফাহানের দুটি ইস্পাত কারখানায় হামলা চালিয়েছে। এরপরই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে মিত্র গোষ্ঠীগুলোসহ ইরান হামলার পরিধি বাড়াল।