এ ধরনের সংঘাতে মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি ব্যাপক। জীবনহানি, পঙ্গুত্ব, বাস্তুচ্যুতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবনতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এর প্রধান মানবিক প্রভাব। অন্যদিকে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, অবকাঠামো ধ্বংস, উৎপাদন হ্রাস, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট ও বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া অর্থনীতিকে দুর্বল করে তোলে।
সাম্প্রতিক পারস্য উপসাগরীয় উত্তেজনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বে মোট তেল ও তরল গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথে পরিবাহিত হয়। গত এক মাসে প্রায় ২,১৯০টি জাহাজ আটকা পড়েছে, যার মধ্যে তেল, গ্যাস ও সারবাহী জাহাজও রয়েছে।
এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছেছে, যা জানুয়ারিতে ছিল ৬৫ ডলার। এতে পরিবহন ব্যয় ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, বিনিয়োগ কমছে এবং কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ‘স্ট্যাগফ্লেশন’-এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, জ্বালানির দাম দীর্ঘমেয়াদে বেশি থাকলে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ০.৩ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্য ০.৫ শতাংশ কমতে পারে। এতে কৃষিতে সেচ ও সার ব্যবহার কমে গিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশের ওপর এই সংঘাতের প্রভাব বহুমাত্রিক। আমদানিনির্ভর জ্বালানির কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কৃষি খাত চাপের মুখে পড়ছে। ফলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে এবং নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠছে।
হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্নের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল, গ্যাস ও সার আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রেশনিং চালু হয়েছে এবং কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদনও কমে গেছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে।
সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেলের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দেশের মোট ধান উৎপাদনের ৫৪ শতাংশ বোরো মৌসুমে হয়—এই সময়ে উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এ ছাড়া সার সংকটও বড় উদ্বেগের কারণ। দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর, যা বর্তমানে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস সংকটে অধিকাংশ সার কারখানা বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে কৃষি উৎপাদন বজায় রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, সার আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজা এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানো প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যয় সংযম এবং কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণই হতে পারে সংকট মোকাবিলার প্রধান উপায়।