এ অবস্থায় ফসলের ক্ষতিকর পোকা শনাক্ত ও দমনে গাইবান্ধায় কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ‘আলোক ফাঁদ’। চলতি আমন মৌসুমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সহায়তায় ও কৃষি বিভাগের তত্ত্বাবধানে আমন ধানের জমির পাশে স্থাপন করা হচ্ছে এ ফাঁদ।
যেভাবে কাজ করে আলোক ফাঁদ
সন্ধ্যার পর আলোক ফাঁদে বাল্ব বা বাতি জ্বালানো হয়। আলোতে আকৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন ধরনের পোকা সেখানে এসে পড়ে। ফাঁদের নিচে রাখা পানির পাত্রে সাবান বা ডিটারজেন্ট মেশানো থাকায় পোকাগুলো পানিতে পড়ে মারা যায়।
এভাবে জমিতে ক্ষতিকর পোকার উপস্থিতি, ধরন ও সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পরে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে কৃষকদের প্রয়োজনীয় দমন ব্যবস্থার পরামর্শ দেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার ১৩০ হেক্টর। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ২৭৮ হেক্টর।
এ মৌসুমে জেলায় হাইব্রিড, তেজগোল্ড, এসিআই-১ ও ২, ব্রি হাইব্রিড, গুটি স্বর্ণা, স্বর্ণা-৫, রনজিৎ, ব্রিধান-৩৪, ৪৯, ৫১, ৫২, ৭৫, ৮৭, ৯৩, ৯৪, ৯৫, ১০৩, ১১০, বিআর-১১ এবং বিনা-২০ ও ২২ জাতের ধান চাষ হয়েছে।
কমছে কীটনাশকের ব্যবহার
ফুলছড়ি উপজেলার উদাখালী ইউনিয়নের পূর্ব ছালুয়া এলাকার কৃষক আব্দুল জলিল ও এন্তাজ আলী বলেন, আগে ক্ষতিকর পোকা শনাক্ত করতে তাদের সমস্যা হতো। এখন আলোক ফাঁদের মাধ্যমে সহজেই জমিতে পোকার উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, পোকার ধরন ও উপস্থিতি বুঝে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হওয়ায় অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহারও কমেছে। ফলে কৃষকদের মধ্যে এ পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
সদর উপজেলার ঝিনাশ্বর এলাকার কৃষক মঞ্জু মিয়াও আলোক ফাঁদের ব্যবহারে সুফল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আগে পোকার আক্রমণ দেখা দিলেই বেশি পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করতেন। এখন ফাঁদে পোকার উপস্থিতি দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ায় কীটনাশকের খরচ কমেছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলোক ফাঁদ শুধু পোকা দমনের কৌশল নয়; জমিতে পোকার আক্রমণের মাত্রা বুঝে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ারও কার্যকর মাধ্যম। এতে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক প্রয়োগ কমার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও কমে। একই সঙ্গে রাসায়নিক কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবেশ সুরক্ষার সুযোগ তৈরি হয়।
নিয়মিত পর্যবেক্ষণে কৃষি বিভাগ
ফুলছড়ি উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সৈয়দ সুমন বলেন, উপজেলার ২১টি ব্লকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার আলোক ফাঁদ স্থাপন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ফাঁদে ধরা পড়া পোকার ধরন ও সংখ্যা পর্যবেক্ষণ করে ক্ষতিকর পোকার উপস্থিতি সম্পর্কে কৃষকদের জানানো হয়। এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দমন ব্যবস্থার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, আলোক ফাঁদ ব্যবহারের ফলে কৃষক অপ্রয়োজনীয়ভাবে কীটনাশক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে পারছেন। এটি পরিবেশবান্ধব একটি পদ্ধতিও।
৬০–৭০ শতাংশ পর্যন্ত কীটনাশক কমানোর সুযোগ
গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) রোস্তম আলী বলেন, ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় শনাক্ত, তাদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে দমনে আলোক ফাঁদ কার্যকর একটি পদ্ধতি। সাধারণত সন্ধ্যার পর দুই থেকে তিন ঘণ্টা আলোক ফাঁদ চালু রাখা হয়।
তিনি জানান, ফসলের জমির পাশে এবং যেখানে পোকার আক্রমণের আশঙ্কা বেশি, সেসব স্থানে আলোক ফাঁদ স্থাপন করা হয়। একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব অথবা হারিকেন/হ্যাজাক বাতির নিচে গামলা বা পাত্র রাখা হয়। পাত্রে পানি দিয়ে তাতে ডিটারজেন্ট পাউডার, সাবানের গুঁড়া কিংবা সামান্য কেরোসিন মেশানো হয়। বাতিটি ফসলের উপরিভাগ থেকে প্রায় এক থেকে দেড় ফুট উঁচুতে স্থাপন করা হয়।
আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পোকাগুলো পানির পাত্রে পড়ে এবং পানিতে মেশানো উপাদানের কারণে মারা যায়।
রোস্তম আলী বলেন, মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, বাদামি গাছফড়িং, কাটুই পোকাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়। ফাঁদে ধরা পড়া পোকার ধরন ও সংখ্যার ভিত্তিতে পরবর্তী দমন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নিয়মিত আলোক ফাঁদ ব্যবহারের মাধ্যমে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব বলেও জানান তিনি।