অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বের বিষয়ে মার্কিন অবস্থান পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এক ভষণে বলেন, ফকল্যান্ড পুনরুদ্ধার করা তার দেশের জন্য জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপগুলোর পাশাপাশি তেল অনুসন্ধানকারী কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। আর্জেন্টিনায় ফকল্যান্ডকে ‘লাস মালভিনাস’ বলা হয়।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ কোথায়?
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ আটলান্টিকে অবস্থিত। দুটি প্রধান দ্বীপসহ প্রায় ৮০০টি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত এ দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মানুষ বাস করেন। এর রাজধানী স্ট্যানলি।
১৮৩৩ সাল থেকে দ্বীপগুলো যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা দ্বীপপুঞ্জ দখল করার চেষ্টা করলে দুদেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।
ফকল্যান্ড যুদ্ধ
১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল আর্জেটিনা ফকল্যান্ড দখল করে। জবাবে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার দ্বীপগুলো পুনর্দখলের জন্য নৌবাহিনী পাঠান।
৭৪ দিন চলা ওই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা এবং তিনজন ফকল্যান্ড দ্বীপবাসী নিহত হন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বাহিনী স্ট্যানলি ঘিরে ফেলে এবং আর্জেন্টাইন সেনাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। যুদ্ধের পর ব্রিটেন দ্বীপগুলোতে সামরিক উপস্থিতি বাড়ায়।
কেন দ্বীপগুলো গুরুত্বপূর্ণ?
ফকল্যান্ডের চারপাশে সমুদ্রসীমায় মাছ ও তেলের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ‘সি লায়ন ফিল্ড’ নামে পরিচিত এলাকায় বিপুল পরিমাণ তেল মজুত থাকার ধারণা করা হয়।
এ তেল সম্পদের কারণে দ্বীপপুঞ্জের ওপর নিয়ন্ত্রণ শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তেল উত্তোলনের সঙ্গ ইসরাইলি মালিকানাধীন একটি কোম্পানির সংশ্লিষ্টতা থাকায় ফকল্যান্ড ইস্যুতে নেতানিয়াহু সরকারের ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে।
ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়?
ফকল্যান্ডের পানিসীমায় তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলন পরিকল্পনায় ইসরাইলি মালিকানাধীন নাভিতাস পেট্রোলিয়ামের ব্রিটিশ সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব রয়েছে। ফলে দ্বীপগুলোর তেল সম্পদকে ঘিরে আর্জেন্টিনা ও ইসরাইলের সম্পর্কেও বিষয়টি প্রভাব ফেলেছে।
তবে ইসরাইল-আর্জেন্টিনার সম্পর্ক একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠও। প্রেসিডেন্ট মিলেই ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। ফলে ফকল্যান্ডের তেল সম্পদ দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্ব অবস্থান নিয়ে দুদেশের মধ্যে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবেও ফকল্যান্ড যুদ্ধে ইসরাইল আর্জেন্টিনাকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিল। ব্রিটেনের আপত্তি সত্ত্বেও ওই সময় আর্জেন্টিনার কাছে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?
ফকল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। ওয়াশিংটন ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দিলেও আর্জেন্টিনার দাবির বিষয়টিও কূটনৈতিকভাবে বিবেচনা করে এসেছে।
তবে ট্রাম্প সম্প্রতি ব্রিটিশ সার্বভৌমত্বের বিষয়ে মার্কিন অবস্থান পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি আর্জেন্টিনার দাবির প্রতি সমর্থন জানায়, তাহলে ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ দিনের ‘বিশেষ সম্পর্ক’-এ বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, ফকল্যান্ড রক্ষায় ব্রিটেন দীর্ঘ দিন ধরে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে আসছে।
সামনে কী হতে পারে?
ফকল্যান্ড নিয়ে আর্জেন্টিনার দাবি নতুন কিছু নয়। তবে মিলেই সরকারের কঠোর অবস্থান, দ্বীপগুলোর তেল সম্পদ এবং ট্রাম্পের মার্কিন নীতি পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত- এ তিনটি বিষয় একসঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
আর্জেন্টিনা কূটনৈকিতভাবে দ্বীপগুলোর ওপর নিজেদের দাবি জোরদার করতে চাইছে। অন্যদিকে ব্রিটেন দ্বীপবাসীদের ইচ্ছা ও নিজেদের সার্বভৌমত্বের অবস্থান ধরে রেখেছে। ফলে ফকল্যান্ড ইস্যুতে আগামী দিনে লন্ডন, বুয়েন্স আয়ারস ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: মিডলইস্ট আই।