কলেজের দেয়ালজুড়ে নির্মম ধ্বংসযজ্ঞের ভয়ার্ত প্রতিচ্ছবি। সেখানে সারি সারি পড়ে আছে মানুষের মৃতদেহ; চোখ-মুখে আতঙ্কের ছাপ নিয়ে খেলনা হাতে দাঁড়িয়ে এক অবুঝ শিশু। পাশেই এই বর্বরতা থেকে মুক্তি পেতে সৃষ্টিকর্তার কাছে ফরিয়াদ করছেন এক নারী। অন্যদিকে দখলদার ইসরায়েলি সৈন্যের আগ্নেয়াস্ত্রের বিপরীতে হুইলচেয়ারে বসে গুলতি হাতে লড়তে দেখা যাচ্ছে এক পা হারানো পঙ্গু ফিলিস্তিনি যুবককে। দেয়ালের ঠিক ওপরেই বড় অক্ষরে লেখা—‘Palestine Solidarity Wall’
ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের মানবতাবিরোধী আগ্রাসনের এমন দেয়ালচিত্র এঁকেছেন ঢাকা কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী রবিন হোসেন। রাজধানীর ঢাকা কলেজের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানাতে গ্রাফিতি আঁকার উদ্যোগ নেন তিনি।
গত ১২ আগস্ট ঢাকা কলেজের মুক্তমঞ্চের পাশের ভবনের দেয়ালে সকাল ১১টা থেকে গ্রাফিতি অঙ্কনের কাজ শুরু হয়। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার অঙ্কন শেষে বিকেল ৫টায় গ্রাফিতিটির কাজ শেষ করেন রবিনের নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী। তারা জানান, ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে চলা গণহত্যা ও মুসলমানদের পবিত্র আল-আকসা ভূমি দখলের মতো ইসরাইলের মানবতাবিরোধী কাজই সংহতি জানানোর উদ্দেশ্য।
গ্রাফিতি অঙ্কনের উদ্যোগ গ্রহণকারী ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী রবিন হোসেন বলেন, ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানানো এবং ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই মূলত এ গ্রাফিতি অঙ্কন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের গণহত্যা চলমান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই গ্রাফিতির মাধ্যমে আমরা তারই ছোট্ট একটি প্রতিবাদ জানাতে চেয়েছি।
শিক্ষার্থী রবিন হোসেন বলেন, ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। গত বছর ‘মার্চ ফর গাজা’ র্যালিতেও আমরা অংশগ্রহণ করেছি। আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সরব উপস্থিতি দেখিয়েছেন।
সেই ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি সহানুভূতি, সচেতনতা ও মানবিকতার জায়গা থেকে ঢাকা কলেজে এই গ্রাফিতি অঙ্কন করা হয়েছে বলে জানান রবিন। তিনি আরও বলেন, এ কাজে শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও সহযোগিতা করেছেন। আমরা চাই, কেউ যেন ফিলিস্তিনকে ভুলে না যায়।
ফিলিস্তিনিদের সংহতি জানিয়ে আঁকা গ্রাফিতিটির প্রশংসা করে ঢাকা কলেজ শিক্ষার্থী মো. ইমন আলী বলেন, পরীক্ষা শেষ করে হলের দিকে আসছিলাম। হঠাৎ মুক্তমঞ্চের পাশের ভবনের দেয়ালের দিকে চোখ যায়। সেখানে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে গ্রাফিতি অঙ্কন করা হয়েছে। বিষয়টি দেখে আমার কাছে খুবই ইতিবাচক মনে হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনের নিরীহ মানুষের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে। তাদের এই হামলায় নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও নিহত হচ্ছে। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। একজন মুসলিম হিসেবে ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি আমাদের সমর্থন সবসময়ই থাকবে।
দেয়ালচিত্রে ধ্বংসস্তূপের পাশে পড়ে থাকা বই ও চিকিৎসাসামগ্রী যুদ্ধের মধ্যে শিক্ষা ও মানবিক বিপর্যয়ের একটি চিত্র তৈরি করেছে। ঘরবাড়ি ধ্বংসের ফলে নারী ও শিশুরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তবে যুদ্ধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের মধ্যেও আরব দেশগুলোর নেতারা দেয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে নিরবে দেখছেন। ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন, এমন চিত্র ফুটে উঠেছে দেয়ালচিত্রে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা গাজা ও ফিলিস্তিনের ওপর চলা সামরিক আগ্রাসনের প্রতিবাদে এবং সংহতি প্রকাশ করে বিভিন্ন সময় ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, র্যালি ও মানববন্ধন করেছেন। শুধু বাংলাদেশে নয় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার শত শত ক্যাম্পাসে তাঁবু গেড়ে প্রতিবাদ, র্যালি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগ তুলে নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রতিবাদে শুরু থোকে সোচ্চার ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা।
ক্লাস, পরীক্ষা বা আড্ডার ফাঁকে শিক্ষার্থীদের চোখে পড়ে দেয়ালটির গ্রাফিতি। ধ্বংসস্তূপ, হুইলচেয়ার, শিশুর খেলনা আর অস্ত্রধারী সৈনিক সবকিছু একটি দেয়ালেই ফুটে উঠেছে। কিন্তু দেয়ালচিত্রটি শুধু একটি যুদ্ধের ছবি ধরে রাখে না; প্রকাশ পায় ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি ঢাকা কলেজের একদল তরুণের সংহতির বার্তা।