২০০৩ সালে আমেরিকা যখন ইরাকে আক্রমণ চালায়, তখন ওমরের বয়স মাত্র ১৮ বছর। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভুয়া অজুহাতে শুরু হওয়া সেই যুদ্ধের ভয়াল স্মৃতি মনে করে ওমর আজও শিউরে ওঠেন; সবকিছু এক মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল। কানে ভেসে আসত শুধু বোমার বিকট শব্দ আর চারপাশের চিৎকার। ওমরের কয়েকজন বন্ধু বাগদাদের রাস্তায় নেমেছিল পরিস্থিতি দেখতে। ওমর বারবার বারণ করেছিলেন, কিন্তু তারা শোনেনি। ওরা গেল, আর কোনো দিন ফিরে এলো না, ওমরের মনে আজও জমে আছে সেই হারানোর তীব্র যন্ত্রণা।
আফগানিস্তানের পাহাড়ি উপত্যকা থেকে শুরু করে ইরাকের তপ্ত মরুভূমি, ইয়েমেন, সোমালিয়া কিংবা পাকিস্তানের গ্রামগুলো; যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল দূর-দূরান্তে। পরিসংখ্যান হয়তো বলে, এসব যুদ্ধে সরাসরি আর পরোক্ষ মিলিয়ে মারা গেছেন প্রায় ৪৭ লাখ মানুষ। কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে ঢাকা পড়ে আছে লাখ লাখ ভাঙা ঘরের গল্প, স্বজনহারা মানুষের কান্না আর অপুষ্টিতে ধুঁকতে থাকা শিশুদের চেহারা।
আফগানিস্তানের ৪০ বছর বয়সী মা আয়েশার জীবনটাই যেন এক ফেরারি গল্প। গত তিন দশকে তিনি কতবার নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়েছেন, তার হিসাব তিনি নিজেও হারিয়ে ফেলেছেন। কখনো তালেবান, কখনো মার্কিন আক্রমণ, আবার কখনো শরণার্থী হিসেবে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় খোঁজা। সবশেষ ইরানে ১১ বছর কাটানোর পর যখন সন্তানদের স্কুল থেকে বের করে দিয়ে তাদের আবারও তাড়িয়ে দেওয়া হলো, তখন আয়েশার উপলব্ধি হয়েছিল; তাদের নিজস্ব বলতে এই পৃথিবীতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
শুধু যাদের ওপর বোমা পড়েছে তারাই নয়, যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন যুদ্ধের পোশাক পরা মানুষরাও। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা মার্কিন সেনাদের বহুজন আজ মানসিক এক গভীর ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রকল্পের তথ্যমতে, যুদ্ধের ময়দানে যত সেনা মারা গেছেন, তার চেয়ে চার গুণ বেশি সেনা দেশে ফিরে আত্মহত্যা করেছেন। গুলির শব্দ থেমে গেলেও তাদের মনের ভেতরের যুদ্ধটা যে থামেনি!
দুই দশকে এই যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ঢেলেছে প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু বন্দুকের নল দিয়ে যে শান্তি কেনা যায় না, আড়াই দশক পর এসে বিশ্ব তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। ৯/১১’র সেই অভিশপ্ত দিনের পর শুরু হওয়া এই অনন্তকালের যুদ্ধ বিশ্বকে নিরাপত্তা তো দিতেই পারেনি, বরং উপহার দিয়েছে গৃহহীন লাখ লাখ মানুষ, ধূলিসাৎ হওয়া শহর আর কখনো না শুকাতে যাওয়া হাজারো মানবিক ক্ষত।