জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শেষ হলেও এখনো হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না। বরং দিন দিন বেড়ে চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তথ্যমতে, টিকা নেওয়ার পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। কিন্তু টিকাদানের দেড় মাস পার হলেও এখনো আগের মতোই আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, যা বেশ উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠিক এ পরিস্থিতিতে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে শিশুদের আইসোলেশন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। কারণ, শিশুর শরীরে র্যাশ ওঠার চার দিন আগ থেকেই অন্যদের মধ্যে হাম ছড়াতে পারে। একজন আক্রান্ত শিশু সর্বোচ্চ ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ঈদের সময় জনস্বার্থে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সতর্কতামূলক নির্দেশনা দেওয়া যেত, কিন্তু তারা তা দেয়নি। ঈদকে কেন্দ্র করে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঝুঁকি প্রবল।
তিনি আরও বলেন, কোনো শিশুর হাম দেখা দেওয়ার চার দিন আগ থেকেই সে অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই যাতায়াতের সময় বড় ধরনের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো অসুস্থ শিশুকে নিয়ে গ্রামে গেলে সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। এতে মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যাবে।
অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব শিশুর বয়স পাঁচ বছরের নিচে, তাদের নিয়ে ঢাকার বাইরে না যাওয়াই ভালো। আর সরকারকে বলব, অবিলম্বে হাম বিষয়ে জনস্বার্থে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করুন, যাতে অভিভাবকেরা সতর্ক হতে পারেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বর্তমানে দেশে হামের সংক্রমণ শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, শিশুদের নিয়ে যাতায়াত ও স্থান পরিবর্তনের ফলে সুস্থ শিশু অসুস্থ শিশুদের মাধ্যমে এবং অসুস্থ শিশু সুস্থ শিশুদের মাধ্যমে আক্রান্ত হবে। এর ফল আমরা আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে দেখতে পারব। এতে সংক্রমণ ও মৃত্যুর বর্তমান পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নির্দেশনা জারি না করার বিষয়ে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এখনো কেন জনস্বার্থে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে না, তা আমার বোধগম্য নয়।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা আছে যেন কোথাও গণজমায়েত না হয়। তারপরও সেটি যথাযথভাবে পালন হচ্ছে না। আমরা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ঈদকেন্দ্রিক কিছু নির্দেশনা দিয়েছি, তবে জনস্বার্থে এখনো কোনো নির্দেশনা জারি করা হয়নি। এটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ।
ঈদকে ঘিরে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আশঙ্কা তো আছেই। যেসব শিশুর জ্বর রয়েছে, তাদের যেন বাইরে না নেওয়া হয় সেজন্য অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ রইল। আমাদের আউটব্রেক কিছুটা কমেছে। তবে গত কয়েকদিন ধরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার একই অবস্থায় রয়েছে।
টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারীর মতে, টিকার কার্যকারিতা শিশুর বয়স, পুষ্টি ও মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভর করে। শিশুর বয়স যত কম, টিকার কার্যকারিতা তত কম। এবারের বিশেষ কর্মসূচিতে ছয় মাস বয়স থেকে টিকা দেওয়া হয়েছে। ছয় মাস বয়সে টিকা দিলে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ কার্যকারিতা পাওয়া যায়। নয় মাস বয়সে দিলে তা প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং ১৫ মাস বয়সে প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যকর হয়।
ঢাকার তিন হাসপাতালের চিত্র
ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে বর্তমানে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ৮১ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১৮ জন এবং এই সময়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এ হাসপাতালে মোট ৮৩২ জন শিশু ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে এবং ৩৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বর্তমানে ৭২ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আটজন শিশু ভর্তি হয়েছে। একজন মারা গেছে এবং নয়জন ছাড়পত্র পেয়েছে। এখন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৪৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯ জন হাম সন্দেহে এবং নয়জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালে বর্তমানে ৪৫৬ জন রোগী ভর্তি আছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯২ জন ভর্তি হয়েছে এবং ১২৪ জন ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। এই সময়ের মধ্যে একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে হামে আক্রান্ত হয়ে ৬ হাজার ৪৫ জন ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৩৫টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।