বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা যেন হঠাৎ করেই হারিয়ে ফেলেছে তার চেনা শান্তি। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া দুইটি মর্মান্তিক ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে আছে পুরো এলাকা—দুই বৃদ্ধা, দুই ভিন্ন গল্প, কিন্তু শেষটা একই—নিঃশব্দ মৃত্যু। ময়দানহাট্টা ইউনিয়নের মহাব্বত নন্দীপুর গ্রামে শনিবার রাতটি ছিল এক ভয়ংকর অন্ধকারের সাক্ষী। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা শাহনাজ বেগম (৭০) যিনি সারাজীবন সততা আর মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন—নিজের ঘরেই হয়ে উঠলেন হত্যার শিকার।
লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে দরজায় কড়া নাড়ে এক নারী ও এক পুরুষ। নিজেদের পরিচিত দাবি করে তারা ঘরে ঢোকে। সহজ-সরল বিশ্বাসে তাদের বসতে দেন, কথা বলেন, এমনকি নিজের হাতে নাস্তার আয়োজনও করেন শাহনাজ বেগম। কিন্তু কে জানতো সেই আপ্যায়নই হবে তার জীবনের শেষ আতিথেয়তা।
পুত্রবধূ রিয়া কাঁদতে কাঁদতে জানান, “আমি পাশের ঘরে যেতেই তারা দরজা বাইরে থেকে আটকে দেয়ৃ বুঝতে পেরে চিৎকার করিৃ লোকজন এসে দরজা ভাঙেৃ”দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকেই সবাই দেখে রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর পড়ে আছেন শাহনাজ বেগম। তাকে দ্রুত শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পথেই নিভে যায় তার জীবনপ্রদীপ। গ্রামজুড়ে এখন শুধু একটাই প্রশ্ন যে মানুষটি সবার জন্য দরজা খুলে দিতেন, তার জন্য কেন এভাবে বন্ধ হয়ে গেল সব পথ?
আরেক সকাল, আরেক মৃত্যু: জমির দ্বন্দ্বে থেমে গেল মায়ের জীবন এই শোক কাটতে না কাটতেই রোববার সকালে আরেকটি খবর আসে—মোকামতলা ইউনিয়নের জাবারীপুর গ্রামে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে মোমেনা খাতুন (৭০) নামের আরেক বৃদ্ধাকে। তার অপরাধ? শুধু মেয়েকে বাঁচাতে এগিয়ে যাওয়া। জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সেই সংঘর্ষে মেয়েকে আঘাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই হয়ে ওঠেন হামলার শিকার। অভিযোগ রয়েছে—নিজেরই আত্মীয়রা তাকে বেধড়ক মারধর করে। ঘটনাস্থলেই নিথর হয়ে যান মোমেনা খাতুন। একটি পরিবার হারালো মা, আরেকটি পরিবার হারালো আশ্রয়।
শিবগঞ্জ থানার ওসি শাহিনুজ্জামান জানিয়েছেন, দুই ঘটনাই গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
শাহনাজ বেগম আর মোমেনা খাতুন দুইজনই হয়তো সাধারণ মানুষ ছিলেন। কিন্তু তাদের মৃত্যু এখন আর শুধু ব্যক্তিগত শোক নয় এটি পুরো সমাজের এক নিঃশব্দ আর্তনাদ। যেখানে বিশ্বাসে লুকিয়ে থাকে ভয়, আর সম্পর্কেই জন্ম নেয় সহিংসতা সেখানে প্রশ্নটা থেকেই যায়, আমরা কি সত্যিই নিরাপদ?