এদিকে গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আক্রান্তের সংখ্যাও হু হু করে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী সারাদেশে হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১,৫০০ ছাড়িয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে। আক্রান্তদের একটি বড় অংশই বর্তমানে দেশের বড় বড় সরকারি হাসপাতালের আইসোলেশন ও আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
রাজশাহী
রাজশাহী অঞ্চলে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি মার্চ মাসে হামে আক্রান্ত অন্তত ১২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউতে নেওয়ার পর ৯ জন এবং আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় ৩ জন শিশু মারা গেছে। রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় জানায়, ১৮ মার্চ ১৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৪৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও পাবনায় সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি।
ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ অঞ্চলেও হামের প্রকোপ ভয়াবহ। গত ১১ দিনে ময়মনসিংহে ১০৫ জন হাম আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে হামজনিত জটিলতায় ৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
সিলেট
সিলেট বিভাগে রবিবার পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ২০ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে চারজনের শরীরে চূড়ান্তভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, বাহুবল ও মাধবপুর এবং সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার শিশু রয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৬ শয্যার একটি আইসোলেশন সেন্টার খোলা হয়েছে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর আগামী ৫ থেকে ৭ এপ্রিলের মধ্যে বিশেষ হাম প্রতিরোধ ক্যাম্পেইন পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামে বর্তমানে ১৭ জন শিশু হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালেই ভর্তি আছে ১১ জন। আক্রান্তদের সবার বয়সই দুই বছরের কম এবং তাদের অধিকাংশের বাড়ি কক্সবাজার জেলায়।
উল্লেখ্য, গত ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হাম শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই ওই অঞ্চলে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। চিকিৎসকদের মতে, টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
বরিশাল
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে বরিশাল বিভাগে। সেখানে চলতি মাসেই ১৩০ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। গত ২৭ মার্চ বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে সেখানে অন্তত ৪০ জন শিশু চিকিৎসাধীন থাকলেও শয্যা সংকটের কারণে অনেককে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে।
সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দেশের বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। শয্যা সংকটের কারণে অনেক হাসপাতালে শিশুদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর অসুস্থ শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় হাইফ্লো অক্সিজেন ও বিশেষায়িত আইসিইউ সুবিধার তীব্র অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ওয়ার্ডে হাম, ডেঙ্গু ও ডায়রিয়া রোগীদের রাখা হচ্ছে, যা সুস্থ শিশুদের মধ্যে নতুন করে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।
কেন বাড়ছে সংক্রমণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে দেশজুড়ে হামের টিকার সরবরাহ সংকটের কারণে শিশুদের একটি বড় অংশ টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে।
পটুয়াখালী ও বরগুনার অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, টিকাদান কেন্দ্রে গিয়েও তারা টিকা পাননি। এ ছাড়া বর্তমানে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে, যাদের এখনো টিকা দেওয়ার বয়সই হয়নি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় নমুনা পরীক্ষা ও তদারকি জোরদার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পৃথক আইসোলেশন কক্ষ চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল কক্ষ বরাদ্দ করলেই হবে না। শিশুদের জন্য আইসিইউ কেয়ার ও অভিজ্ঞ জনবল দ্রুত নিয়োগ দিতে হবে। এ ছাড়া ৯ মাস বয়স হওয়ার আগেই শিশুদের টিকা প্রদানের বিষয়ে কারিগরি কমিটির দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিলেই শিশুকে ঘরোয়া চিকিৎসায় না রেখে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।