বিশ্বকাপের ধারণা জন্ম নেয় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। সে সময় আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা ছিল অলিম্পিক গেমস। কিন্তু ফুটবলের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা একটি স্বতন্ত্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা করে। ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের উদ্যোগে ১৯২৮ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রতি চার বছর অন্তর বিশ্বের সেরা ফুটবল দল নির্ধারণে একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হবে।
সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ নেয় ১৯৩০ সালে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়। মাত্র ১৩টি দল অংশ নেয় সেই আসরে। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়ে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে উরুগুয়ে। তখন হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি, এই প্রতিযোগিতা একদিন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় ক্রীড়া আসরে পরিণত হবে।
প্রথম বিশ্বকাপের পর ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে ইতালি টানা দুটি শিরোপা জিতে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন সম্ভব হয়নি। যুদ্ধ শেষে ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে আবারও ফিরে আসে বিশ্বকাপ।
১৯৫০ সালের সেই বিশ্বকাপ আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় অধ্যায়। রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় দুই লাখ দর্শকের সামনে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে স্বাগতিক ব্রাজিলকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় উরুগুয়ে। ইতিহাসে ঘটনাটি ‘মারাকানাজো’ নামে অমর হয়ে আছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দলের নাম ব্রাজিল। ১৯৫৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে পেলের আবির্ভাব বিশ্ব ফুটবলের গতিপথ বদলে দেয়। তার নেতৃত্বে ব্রাজিল ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে বিশ্বকাপ জেতে। পরবর্তীতে ১৯৯৪ ও ২০০২ সালেও শিরোপা জিতে তারা পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। এখন পর্যন্ত আর কোনো দেশ পাঁচবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি।
ব্রাজিলের পর সবচেয়ে সফল দেশ জার্মানি ও ইতালি। দুই দেশই চারবার করে বিশ্বকাপ জিতেছে। জার্মানির শিরোপাগুলো আসে ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে। অন্যদিকে ইতালি চ্যাম্পিয়ন হয় ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ ও ২০০৬ সালে।
আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছে তিনবার। ১৯৭৮ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথমবারের মতো শিরোপা জয়ের স্বাদ পায় তারা। এরপর ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনার অসাধারণ নৈপুণ্যে দ্বিতীয় শিরোপা আসে। দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার পর ২০২২ সালে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।
ফ্রান্স দুটি বিশ্বকাপ জিতেছে। ১৯৯৮ সালে নিজেদের দেশে প্রথমবার শিরোপা জয়ের পর ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার বিশ্বসেরা হয় তারা। উরুগুয়ে দুটি শিরোপা জিতেছে ১৯৩০ ও ১৯৫০ সালে। ইংল্যান্ডের একমাত্র বিশ্বকাপ আসে ১৯৬৬ সালে, আর স্পেন প্রথম ও একমাত্রবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয় ২০১০ সালে।
বিশ্বকাপের ইতিহাস শুধু দলীয় সাফল্যের নয়, এটি কিংবদন্তিদের গল্পও। পেলে, ম্যারাডোনা, জিনেদিন জিদান, রোনালদো, রোনালদিনিও, জিনেদিন জিদান, মিরোস্লাভ ক্লোসে, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির মতো তারকারা এই মঞ্চকে আরও মহিমান্বিত করেছেন।
বিশ্বকাপের পথচলায় সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যায়ও। প্রথম আসরে ১৩টি দল খেললেও পরে সেই সংখ্যা ১৬, ২৪ ও ৩২-এ উন্নীত হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত ৩২ দলের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে ২০২৬ সালে শুরু হচ্ছে নতুন যুগ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নেবে ৪৮টি দল।
এটি হবে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ, যা তিনটি দেশ যৌথভাবে আয়োজন করবে। নতুন ফরম্যাটের কারণে ম্যাচসংখ্যাও বাড়বে এবং আরও বেশি দেশ বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাবে।
বিশ্বকাপের প্রায় শতবর্ষের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ২২টি আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র আটটি দেশ শিরোপা জিততে পেরেছে। ব্রাজিল পাঁচবার, জার্মানি চারবার, ইতালি চারবার, আর্জেন্টিনা তিনবার, ফ্রান্স দুইবার, উরুগুয়ে দুইবার, ইংল্যান্ড একবার এবং স্পেন একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
১৯৩০ সালে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করা বিশ্বকাপ আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংকট, কিংবদন্তির উত্থান-পতন, অশ্রু ও আনন্দ; সবকিছুর সাক্ষী এই টুর্নামেন্ট। ২০২৬ সালে যখন ২৩তম বিশ্বকাপের পর্দা উঠবে, তখন আরও একটি নতুন অধ্যায় যোগ হবে ফুটবলের এই মহাকাব্যে। আর কোটি কোটি দর্শক আবারও অপেক্ষা করবে, কে হবে বিশ্বের নতুন ফুটবল সম্রাট।