ফুটবলপ্রেমীদের বড় একটি অংশের মতে, ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের পর পাল্লাটা কিছুটা হলেও মেসিদের দিকে ঝুঁকেছে। গবেষণাভিত্তিক বিভিন্ন আলোচনাতেও দেখা গেছে, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের পর থেকেই বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-ভক্তদের বড় একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, যা মেসির বিশ্বকাপ জয়ের পর আরও বিস্তৃত হয়েছে।
একসময় বাংলাদেশে ব্রাজিল সমর্থকদের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। পেলে, জিকো, রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনহো, কাকা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলের প্রেমে পড়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপ জিততে পারেনি সেলেসাওরা। ২৪ বছর ধরে শিরোপাহীন ব্রাজিলের সমর্থকদের এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অপেক্ষার অবসান কি এবার হবে?
২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২; টানা পাঁচ বিশ্বকাপেই হতাশা সঙ্গী হয়েছে ব্রাজিলের। বিশেষ করে ২০১৪ সালে নিজেদের মাটিতে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের বিধ্বংসী হার আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায়। এরপরও প্রতিবারই নতুন স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপে যায় ব্রাজিল, কিন্তু ট্রফি অধরাই থেকে গেছে।
তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে নতুন পথচলা শুরু করেছে ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, ব্রুনো গিমারাইস, আলিসনদের সঙ্গে দলে আছেন নেইমারও। যদিও তার ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তবু ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা বিশ্বাস করেন, ১৯৯৪ সালের মতো এবারও উত্তর আমেরিকার মাটিতে শিরোপা জয়ের ইতিহাস লেখা সম্ভব।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে তারা নামছে শিরোপা ধরে রাখার মিশনে। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে গড়া দলটি গত কয়েক বছরে বিশ্ব ফুটবলে ধারাবাহিকতার এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও অন্যান্য বড় আসরে সাফল্যের কারণে আর্জেন্টিনা এবারও অন্যতম ফেভারিট।
বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কাছে অবশ্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ একটাই লিওনেল মেসি। ৩৮ বছর বয়সী এই মহাতারকার জন্য এটিই সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ। ২০০৬ সালে শুরু হওয়া বিশ্বকাপ যাত্রা এখন ষষ্ঠ আসরে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন তিনি ২০২২ সালে পূরণ করেছেন। এবার তার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ শিরোপা ধরে রাখা এবং ইতিহাসে নিজের কিংবদন্তিকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়া।
তবে মেসিকে ঘিরে কিছু উদ্বেগও আছে। সাম্প্রতিক সময়ে পেশির ক্লান্তি ও শারীরিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও আর্জেন্টিনা শিবির আশাবাদী, তবু সমর্থকদের মনে শঙ্কা রয়েই গেছে, শেষ বিশ্বকাপে তিনি কতটা ফিট থাকবেন?
বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম; সব জায়গায় এখন একই বিতর্ক। কেউ বলছেন, মেসির জন্য আরেকবার আর্জেন্টিনা। কেউ বিশ্বাস করছেন, ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে ব্রাজিলই ট্রফি তুলবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এবার হয়তো নতুন কোনো চ্যাম্পিয়ন দেখা যাবে।
কিন্তু একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত; মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং নেইমারের যুগের শেষ অধ্যায় দেখতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি একটি প্রজন্মের স্মৃতিরও বিদায়বেলা। আর সেই আবেগে বাংলাদেশের আকাশে আবারও উড়ছে নীল-সাদা আর হলুদ-সবুজের পতাকা। কে জিতবে, তার উত্তর মিলবে মাঠে। কিন্তু উন্মাদনার লড়াইয়ে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছে।