তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল হওয়া সত্ত্বেও ব্রাজিলের সাম্প্রতিক সময়টা মোটেও মসৃণ যায়নি। ২০০২ সালে জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে সর্বশেষ শিরোপা জয়ের পর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৪ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে বহুবার হেক্সা (ষষ্ঠ) জয়ের স্বপ্ন দেখলেও শেষ পর্যন্ত নকআউট পর্বের হতাশা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে হলুদ জার্সিধারীদের। তবু আশার আলো দেখছেন সমর্থকেরা। নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান ফুটবলারদের ওপর ভর করে ২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন বুনছে ব্রাজিল।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিলই একমাত্র দল, যারা সর্বোচ্চ পাঁচবার (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ ও ২০০২) সোনালি ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে। বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই দলটিকে সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, তাদের ‘ফুটবলের ডিএনএতেই’ মিশে আছে আক্রমণাত্মক শৈলী, আত্মবিশ্বাস আর মাঠে তাৎক্ষণিক সৃজনশীলতা দেখানোর সহজাত ক্ষমতা।
বর্তমান ব্রাজিল দলটি আগের মতো কেবল একক কোনো তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়। দলের মূল ভরসা এখন তরুণ ও অভিজ্ঞদের এক সমন্বিত স্কোয়াড। সেলেসাওদের আগামী দিনের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন ভিনিসিউস জুনিয়র, রদ্রিগো, রাফিনহা, ব্রুনো গুইমারায়েস, গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস ও আলিসন বেকার।
বিশেষ করে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ক্লাব ফুটবলে ধারাবাহিক পারফর্ম করা ভিনিসিউস জুনিয়রকে আসন্ন বিশ্বকাপের অন্যতম বড় তারকা মনে করা হচ্ছে। যেকোনো রক্ষণভাগ চূর্ণ করার সামর্থ্য রয়েছে এই ফরোয়ার্ডের।
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখন বড় প্রশ্ন, ২০২৬ কি নেইমারের শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে? ইনজুরি এবং বয়সের কারণে আগের মতো গতি ও ধারাবাহিকতা না থাকলেও তার মাঠের উপস্থিতি ও অভিজ্ঞতা দলের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, নেইমার যদি টুর্নামেন্টে পুরোপুরি ফিট থাকেন, তবে তিনি ব্রাজিলের জন্য বড় এক্স-ফ্যাক্টর বা পার্থক্য গড়ে দেয়া খেলোয়াড় হতে পারেন।
ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা তাদের গতিময় আক্রমণভাগ। বিশ্বের অন্যতম সেরা ও সৃজনশীল উইঙ্গাররা এখন এই দলে খেলছেন, যারা প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে গোল তৈরিতে পটু। পাশাপাশি গোলপোস্টের নিচে আলিসন বেকার এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক। বড় ম্যাচে তার শান্ত ও ঠান্ডা মাথার পারফরম্যান্স দলকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগায়। সর্বোপরি, স্কোয়াডের প্রায় প্রতিটি খেলোয়াড়েরই একক প্রতিভায় ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
শক্তির পাশাপাশি কিছু উদ্বেগের জায়গাও রয়েছে ব্রাজিলের। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের বড় দলগুলোর বিপক্ষে ব্রাজিলের রক্ষণভাগের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও ভারসাম্যের অভাব স্পষ্ট হয়েছে। এছাড়া ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক বিপর্যয় এবং পরবর্তী বিশ্বকাপগুলোর নকআউট পর্বের ব্যর্থতা এখনো অবচেতন মনে ভর করে আছে। ফলে নকআউট পর্বের চরম স্নায়ুচাপ সামলানো হবে তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি, ঐতিহ্যগতভাবে রোনালদো, রোমারিও বা আদ্রিয়ানোর মতো একজন নিখুঁত ও ভয়ঙ্কর স্ট্রাইকারের (নাম্বার নাইন) অভাব বর্তমানে দলটিতে রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান স্কোয়াডের গভীরতা ও খেলোয়াড়দের মান বিবেচনায় ব্রাজিলকে সেমিফাইনালের অন্যতম দাবিদার বলা যায়। তবে স্পেন, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মতো সমমানের দলগুলোর বিপক্ষে লড়াইটা মোটেও সহজ হবে না। বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিল যদি তাদের রক্ষণভাগ আরও সুসংগঠিত করতে পারে, তবে ফাইনালের মঞ্চে যাওয়া অসম্ভব নয়।
২০২৬ বিশ্বকাপ ব্রাজিলের জন্য তাদের হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার মিশন। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আবারও বিশ্বকে দেখাতে চায় যে সাম্বার জাদু এখনো ফুরিয়ে যায়নি। সোনালি ট্রফি কি এবার লাতিন আমেরিকায় ফিরবে, নাকি অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হবে, উত্তর মিলবে মাঠেই। তবে হলুদ জার্সির সাম্বা নৃত্যের মোহে ফুটবল বিশ্ব যে আবারও বুঁদ হতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত।