পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ বা জেনারেল ইকোনমিক্স ডিভিশন (জিইডি) প্রকাশিত ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক, ফেব্রুয়ারি ২০২৬’ প্রতিবেদনে অর্থনীতির কিছু সূচকে সীমিত স্থিতিশীলতার আভাস পাওয়া গেলেও রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন ব্যয়ের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব যুক্ত হলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
জিইডির সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন সংকটের কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিতে পারে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব স্পষ্ট হবে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে। তাই সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
মূল্যস্ফীতিতে বাড়তি চাপের আশঙ্কা
দেশে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার লক্ষণ দেখা গেলেও তা এখনো আরামদায়ক পর্যায়ে নামেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এর (বিবিএস) তথ্য বলছে, টানা চার মাস বৃদ্ধির পর মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি হয়েছে। একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, অনেক মানুষের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় আয়ের তুলনায় বেশি হয়ে পড়ছে, ফলে অনেকে ধার বা ঋণের ওপর নির্ভর করছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘ হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে পারে। এতে পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এবং শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে, ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিনিয়োগে দুর্বলতা অব্যাহত
দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত হলে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আরও সতর্ক হয়ে যেতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হলে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমে যেতে পারে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
রাজস্ব ঘাটতিতে বাড়তি চাপ
চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২.৯ শতাংশ, যদিও লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪.৫ শতাংশ। অর্থবছরের বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে প্রায় ৫৯.৪ শতাংশ হারে রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা বাস্তবে কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব সংগ্রহ কম হওয়ায় সরকারকে ব্যাংকিং খাত থেকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংক থেকে ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কারণে আর্থিক খাতে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও কমে যাচ্ছে। একই সময় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি
উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ২০ থেকে ২১ শতাংশের মধ্যে, যা গত দেড় দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
প্রকল্প প্রস্তুতিতে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়লে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ব্যয়ও বাড়তে পারে এবং বাস্তবায়ন সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে।
বৈদেশিক খাতে মিশ্র চিত্র
বৈদেশিক খাতে একই সঙ্গে ইতিবাচক ও উদ্বেগজনক দুই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে এবং প্রবাস আয়ও মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে আন্তর্জাতিক সংঘাত দীর্ঘ হলে প্রবাস আয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় ওই অঞ্চলের শ্রমবাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে রেমিট্যান্সের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ বিষয়ে আরএমজি সেন্টারের সভাপতি মেহেদী মাহবুব বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই অঞ্চল দেশের শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ তীব্র হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিও দুর্বল হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বাড়বে। বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সেখানে অস্থিরতা দেখা দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি আকাশপথে চলাচলে সীমাবদ্ধতা এলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যয় বাড়বে এবং বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ স্বল্পমেয়াদি হোক বা দীর্ঘমেয়াদি—উভয় পরিস্থিতির সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় সরকার পরিকল্পনা করছে।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কর ও শুল্ক কমানোর মতো নীতিগত উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনীতির কিছু সূচকে স্থিতিশীলতার আভাস থাকলেও ভেতরে ভেতরে বিভিন্ন ঝুঁকি জমা হচ্ছে। রাজস্ব ঘাটতি, বিনিয়োগে দুর্বলতা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি ইতোমধ্যে অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব যুক্ত হলে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় বৈশ্বিক অস্থিরতার ধাক্কায় দেশের অর্থনীতি আবারও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।