চালকদের ভাষ্য, প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনমতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে স্বাভাবিকভাবেই ট্রিপ কমে যাচ্ছে, সঙ্গে কমছে আয়। অন্যদিকে সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীও কমে গেছে। সামান্য বেশি ভাড়া চাইলেই যাত্রীরা অন্য বাহনে চলে যাচ্ছেন।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাবে রাজধানীর সড়কে রাইড শেয়ারিং কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অনেক চালকের আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। পেট্রোল পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়েই দিনের বড় অংশ কেটে যাচ্ছে। মোটরসাইকেলনির্ভর এই চালকেরা এমন বাস্তবতায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
খরচ বেড়েছে জ্বালানিতে
গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাতে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা করা হয়েছে। অকটেনের দাম ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ১২০ টাকা। পেট্রোলের দাম লিটারে ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে (আগে ছিল ১১৬ টাকা)। কেরোসিনের দাম ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে চালকদের দৈনন্দিন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, যা তাদের আয়ে সরাসরি চাপ তৈরি করছে।
ট্রিপ ও আয় দুটোই কমেছে
রোববার (১৯ এপ্রিল) রাজধানীর ধানমন্ডি, রমনা, তেজগাঁও, গুলশান ও বাড্ডা এলাকায় একাধিক চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত এক মাসে তাদের আয় অর্ধেকেরও কমে এসেছে। আগে দিনের ব্যস্ত সময়ে যাত্রী পরিবহন করেই সময় কেটে যেত, এখন সেই সময়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে।
চালকদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও অনেক সময় পর্যাপ্ত জ্বালানি মেলে না। ফলে ট্রিপ কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি বিকল্প যানবাহনের কারণে যাত্রীসংখ্যাও হ্রাস পাচ্ছে।
নীলক্ষেত এলাকায় মোটরসাইকেল চালক রাসেল আক্তার বলেন, ‘আগে কোনোভাবে আয় দিয়ে সংসার চালানো যেত। এখন তেলের দাম বেড়েছে, কিন্তু যাত্রী কমেছে। এতে বাইক নিয়ে বের হওয়াই কঠিন হয়ে গেছে।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিশ্বে কোথায় কী হচ্ছে, তার প্রভাব আমাদের মতো সাধারণ চালকদের ওপর এসে পড়ছে। এই দাম বৃদ্ধি আমাদের একেবারে চাপে ফেলে দিয়েছে।’
গুলিস্তানগামী এক যাত্রীর সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দরকষাকষির অভিজ্ঞতা জানিয়ে চালক আবুল খায়ের বলেন, পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়েছে। আগে যেখানে ১০০ টাকায় যাওয়া যেত, এখন ১২০ টাকা চাইলে যাত্রীরা রাজি হন না।
গুলশানের সোহেল আক্তার জানান, কিস্তিতে মোটরসাইকেল কিনে এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন তিনি। আগে আয় থেকে কিস্তি দেওয়া সম্ভব হলেও এখন তা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে থাকতে হয়। আয় কমে গেছে। তেলের দাম বাড়ায় সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে গেছে।’
মগবাজার এলাকায় তেলের অপেক্ষায় থাকা সোহান আক্তার বলেন, আগে দিনে বেশি ট্রিপ দেওয়া যেত। এখন তেলের সংকট ও যাত্রী কমে যাওয়ায় ট্রিপের সংখ্যা কমেছে। এভাবে চলতে থাকলে পেশা পরিবর্তনের কথাও ভাবতে হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন ব্যয় বাড়ায়নি, বরং রাইড শেয়ারিংয়ের মতো স্বনির্ভর খাতে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে নগরের বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।