বাবার সেই স্বপ্নকে আরও বড় করে দেখতে চায় ছোট ছেলে মো. সাহাদত হোসেন। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে ১ হাজার ১৬৭ নম্বর পেয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে সে। বিদ্যালয় ও পরিবারের তথ্যমতে, মানবিক বিভাগে তার এই ফলাফল উপজেলায় অন্যতম সেরা, সে প্রথম স্থানও অর্জন করেছে।
অভাবের সঙ্গে লড়াই সাহাদতদের পরিবারের নতুন নয়। বাবা মেরাজুল আলী পেশায় ভ্যানচালক। প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থ দিয়েই তিনি সন্তানদের শিক্ষার পথ খুলে রেখেছেন। বড় ছেলে বর্তমানে গোপালগঞ্জের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং মেয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। আর ছোট ছেলে সাহাদতও এবার নিজের মেধা ও অধ্যবসায় দিয়ে পরিবারের স্বপ্নে নতুন আলো জ্বালিয়েছে।
সাহাদতের পড়াশোনার পথটাও ছিল সহজ নয়। দামি কোচিং কিংবা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা তার নাগালে ছিল না। তবু নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকদের পরামর্শ এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করেই এগিয়েছে সে। মানবিক বিভাগ থেকে পাওয়া ১ হাজার ১৬৭ নম্বর তার সেই পরিশ্রমেরই স্বীকৃতি।
সাহাদত জানায়, ভবিষ্যতে সে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হতে চায়। শুধু একটি ভালো চাকরি পাওয়াই তার লক্ষ্য নয়, সততা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চায় সে। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টায় নিজের অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার স্বপ্নও দেখে এই কিশোর।
তার ভাষায়, জীবনে বড় হতে হলে অর্থের চেয়ে বেশি প্রয়োজন লক্ষ্য, পরিশ্রম ও মানুষের দোয়া। বাবার কষ্টকে কাছ থেকে দেখেই জীবনের বাস্তবতা শিখেছে সে। তাই ভবিষ্যতে এমন জায়গায় যেতে চায়, যেখান থেকে সাধারণ মানুষের উপকার করা সম্ভব হবে।
মেরাজুল আলীর জীবনের হিসাব খুব সাধারণ—দিন শেষে যতটুকু আয়, তা দিয়েই সংসার আর সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটানো। কিন্তু তার স্বপ্ন সাধারণ নয়। নিজের জীবনে সুযোগ না পেলেও সন্তানদের শিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান তিনি। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও বড় ছেলে-মেয়ের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ছোট ছেলের পড়াশোনায়ও সাহস জুগিয়ে যাচ্ছেন।
একজন ভ্যানচালক বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া সাহাদতের সামনে পথ এখনো দীর্ঘ। তবে তার ফলাফল যেন বলে দেয়—স্বপ্নের উচ্চতা ঠিক করে দেয় না পরিবারের আয় কিংবা সামাজিক অবস্থান, দৃঢ় ইচ্ছা, শ্রম আর সুযোগ পেলে প্রত্যন্ত জনপদের একটি সাধারণ ঘর থেকেও উঠে আসতে পারে অসাধারণ গল্প।
সাহাদতের এখন প্রত্যাশা একটাই—সবার দোয়া ও সহযোগিতা নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, আর একদিন প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা।