মাঠে ফসল ফলাতে বাড়তি খরচ, আর বাজারে বিক্রির সময় ন্যায্য দাম না পাওয়ার শঙ্কা— দুই দিকের চাপে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার কৃষকরা। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, জ্বালানি ও শ্রমিকের মজুরি— প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে ফসলের দাম পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন কৃষকরা।
পদ্মার পলিমাটিতে গড়ে ওঠা গোয়ালন্দ উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ কৃষিনির্ভর। নদীর পলি জমে এখানকার মাটি কৃষির জন্য উপযোগী হওয়ায় ধান, পাট, সবজি ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের আবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজারো কৃষক। তবে উৎপাদন উপকরণের মূল্য ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে কৃষিকাজ।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, জ্বালানি ও শ্রমিকের মজুরি— প্রায় সব খাতেই বেড়েছে ব্যয়। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় জমি প্রস্তুত ও সেচ খরচেও এর প্রভাব পড়েছে।
কৃষকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার একই জমিতে চাষ করতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। কোথাও কোথাও বিঘাপ্রতি উৎপাদনব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
কৃষক সুরুজ মিঞা বলেন, এবার গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। প্রতিটি জিনিসের দাম বেশি। শ্রমিকের মজুরি, সার-কীটনাশক ও জ্বালানির দামও বেড়েছে। কিন্তু ফসল বিক্রি করতে গেলে ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। কৃষক যেন তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান, সরকারের কাছে এটাই আমাদের দাবি।
একাধিক কৃষক অভিযোগ করে বলেন, একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে ফসল বিক্রির সময় কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তাদের মতে, শুধু উৎপাদন খরচ কমালেই হবে না, ফসলের ন্যায্য বাজারমূল্যও নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদনে বেশি টাকা খরচ করে বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হলে পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদে কৃষকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।
চলতি মৌসুমে গোয়ালন্দের বিভিন্ন এলাকায় বোরো ধান, আগাম সবজি ও অন্যান্য ফসলের আবাদ হয়েছে। এখন কৃষকদের বড় উদ্বেগ— উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজারে ফসলের দাম পাওয়া যাবে কি না।
এদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ বছর সার ও কীটনাশকের সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। নির্ধারিত ডিলারদের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যে সার ও কীটনাশক সংগ্রহ করতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সার পাচার, মজুত বা অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রায়হানুল হায়দার বলেন, বিগত বছরের চেয়ে এ বছর সার ও কীটনাশক পর্যাপ্ত আছে। নির্ধারিত ডিলারদের কাছ থেকে নির্ধারিত দামে নেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে কৃষকদের বক্তব্য, উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়লেও ফসল বিক্রির সময় সেই বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তাই সার, কীটনাশক ও জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দাম নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।