গত ১ এপ্রিল হোয়াইট হাউজ থেকে দেওয়া এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেন, মার্কিন দাবি না মানলে দেশটিকে ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, যেখানে তাদের থাকার জায়গা’। ওই ভাষণের পরপরই মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছিলেন, ‘প্রস্তর যুগে ফিরে যাও’।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল সিকিউরিটি অধ্যাপক জানিনা ডিল ট্রাম্পের এই হুমকির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আধুনিক সমাজের অবকাঠামো ধ্বংসের এই হুমকি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ এটি বেসামরিক স্থাপনায় আক্রমণের নির্দেশ দেয়।’ তার মতে, এই বক্তব্য বিশেষভাবে জঘন্য, কারণ এটি প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র কেবল ইরানি শাসনের বিরুদ্ধে নয়, বরং সমগ্র ইরানি জনগণ ও সমাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে।
হুমকির শুরু ভিয়েতনামে
‘বোমা মেরে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়া’, এই শব্দবন্ধের সূত্রপাত ১৯৬৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়। মার্কিন বিমানবাহিনীর জেনারেল কার্টিস লিমে তার ‘মিশন উইথ লিমে’ বইতে লিখেছিলেন, উত্তর ভিয়েতনামীদের আগ্রাসন বন্ধ না হলে তাদের বোমা মেরে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যদিও পরে তিনি একে কেবল একটি সামরিক সক্ষমতার বর্ণনা বলে দাবি করেন। কিন্তু ১৯৭২ সালের ‘ক্রিসমাস বোমিং’ অভিযানে হ্যানয় ও হাইফং শহরে ১২ দিনে ১৫ হাজার টনের বেশি বোমা ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও একই সুর শোনা গিয়েছিল তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকারের কণ্ঠে। কুয়েত থেকে সেনা প্রত্যাহার না করলে তিনি ইরাককে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
৯/১১ ও পাকিস্তান প্রসঙ্গ
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পর পাকিস্তানের ওপর চাপ বাড়াতে একই ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ তার স্মৃতিকথা ‘ইন দ্য লাইন অব ফায়ার’-এ লিখেছেন, তৎকালীন মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিচার্ড আর্মিটেজ হুমকি দিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা না করলে পাকিস্তানকে বোমা মেরে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যদিও আর্মিটেজ পরে এই নির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহারের কথা অস্বীকার করেন।
ইরানের কঠোর জবাব
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকির জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে লিখেছেন, ‘বর্তমান যুগ ও প্রস্তর যুগের মধ্যে বড় একটি পার্থক্য হলো তখন মধ্যপ্রাচ্যে কোনও তেল বা গ্যাস উত্তোলন হতো না। প্রেসিডেন্ট কি নিশ্চিত যে তিনি ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দিতে চান?’
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মার্কিন জনগণের উদ্দেশে এক খোলা চিঠিতে হাসপাতাল ও ওষুধ কারখানার ওপর হামলাকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানের এক জেনারেল ট্রাম্পকে আক্রমণ করে বলেছেন, ‘হলিউডের বিভ্রম তোমাদের মস্তিষ্ক বিষিয়ে তুলেছে। মাত্র ২৫০ বছরের ইতিহাস নিয়ে তোমরা ৬ হাজার বছরের সভ্যতাকে হুমকি দিচ্ছো!’
এর বিপরীতে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে পুনরায় হুমকি দিয়ে লিখেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী এখনও ইরানে ধ্বংসযজ্ঞ শুরুই করেনি। তিনি পর্যায়ক্রমে সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।