একসময় দেশি মুরগির বিকল্প হিসেবে সোনালি মুরগি ছিল সাশ্রয়ী প্রোটিনের উৎস। তবে গত এক মাসে এই মুরগির দাম লাফিয়ে বেড়ে কেজিপ্রতি ২৮০–৩১০ টাকা থেকে ৪১০–৪৪০ টাকায় পৌঁছেছে। হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে জটিল এক সরবরাহ চক্র, যেখানে প্রতিটি ধাপেই বাড়ছে দাম।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পোলট্রি খাতের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এই মূল্যবৃদ্ধির সূচনা করে। তাদের কাছ থেকে একদিন বয়সী বাচ্চা কিনে খামারিরা উৎপাদন শুরু করেন। ফেব্রুয়ারিতে এসব বাচ্চার দাম ৩০–৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫–৫৫ টাকায় পৌঁছায়। খামারিরা বলছেন, ফ্লুতে ক্ষতির কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই দাম বাড়ানো হয়।
খামার পর্যায়ে এক কেজি সোনালি মুরগি উৎপাদনে বর্তমানে খরচ পড়ে প্রায় ২৬০–২৭০ টাকা। এর সঙ্গে সামান্য লাভ যোগ করে মার্চে তারা ২৮০–৩০০ টাকায় বিক্রি করলেও এপ্রিলের শুরুতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩০–৩৪০ টাকায়। খামারিদের দাবি, আগের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বাধ্য হয়েই তারা দাম বাড়িয়েছেন।
তবে প্রকৃত মূল্যবৃদ্ধির বড় অংশ ঘটছে খামার থেকে খুচরা বাজারে যাওয়ার পথে। মধ্যস্বত্বভোগী, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতা—এই তিন ধাপে প্রতি কেজিতে ৮০–১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি যোগ হচ্ছে। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট ও কম বিক্রির অজুহাতে প্রতিটি স্তরেই বাড়ছে লাভের পরিমাণ।
রাজধানীর বাজারগুলোতে এখন সোনালি মুরগি ৪৩০–৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক সপ্তাহ আগেও ছিল ৩৫০ টাকার আশপাশে। অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগির দাম প্রায় স্থিতিশীল থাকায় অনেকেই এই মূল্যবৃদ্ধিকে ‘টার্গেটেড’ বলে মনে করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগ নিয়েই এই দাম বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে সোনালি মুরগির উৎপাদন সময় বেশি হওয়ায় সরবরাহ সীমিত থাকে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করে।
পোলট্রি খাতের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করছেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বাচ্চা, খাদ্য ও ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণ করায় খামারিরা নির্ধারিত দামে কিনতে বাধ্য হন। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং তার প্রভাব পড়ে ভোক্তা পর্যায়ে। অন্যদিকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, বৈশ্বিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানিজনিত জটিলতার কারণেই খরচ বেড়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বাজারে স্বচ্ছতা ও কার্যকর তদারকির অভাবেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তারা দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ, সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানোর দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা—এখনই ব্যবস্থা না নিলে পোলট্রি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হতে পারে। আর এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে সাধারণ ভোক্তারা, যাদের জন্য সোনালি মুরগি ছিল তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রোটিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।