ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, সীমান্ত সমস্যার সমাধানে শুধু প্রতীকী ঘোষণা নয়, বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তার মতে, যেকোনো উদ্যোগ হতে হবে আইনগতভাবে টেকসই, কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ এবং বাস্তবায়নযোগ্য।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ইতোমধ্যে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, এলোমেলোভাবে ‘পুশব্যাক’ অভিযান চালানোর পরিবর্তে প্রকৃত অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে যাচাই-বাছাই শেষে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা।
সূত্রগুলোর দাবি, ভারত এবার এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না, যাতে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ক অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতীতে সমন্বয়হীন ‘পুশব্যাক’ কার্যক্রম নিয়ে ঢাকা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
তাই এবার নয়াদিল্লি একটি কাঠামোগত পদ্ধতিতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে চায়। ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা শুধু আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি মানবিক, ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের বড় অংশ জনবসতি, কৃষিজমি, নদীবিধৌত চরাঞ্চল, বনভূমি ও দুর্গম এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। অনেক স্থানে আন্তর্জাতিক সীমারেখা গ্রামের ভেতর দিয়ে গেছে, যেখানে বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করছে।
ভারত সরকার বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে সীমান্তে বেড়া নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। এ জন্য ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ জোরদার করা হয়েছে। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, পুরো সীমান্তে বেড়া নির্মাণ সহজ নয়।
সরকারের মতে, শুধু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই প্রকল্প সফল হবে না। সীমান্তবর্তী এলাকার কৃষক, গ্রামবাসী ও জমির মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের আস্থা অর্জন করাও জরুরি। কারণ বেড়া নির্মাণের ফলে অনেক ক্ষেত্রে কৃষিকাজ, চলাচল ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ২১৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬৪৭ দশমিক ৬৯৬ কিলোমিটার এলাকায় বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এখনো প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত অরক্ষিত রয়েছে।
এর মধ্যে ১১২ দশমিক ৭৮০ কিলোমিটার নদী ও জলাভূমি হওয়ায় প্রচলিত পদ্ধতিতে বেড়া নির্মাণ সম্ভব নয়। এছাড়া ৪৫৬ দশমিক ২২৪ কিলোমিটার এলাকায় কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে।
বিজেপি সরকারের দাবি, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে প্রায় ৬০০ একর জমি বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। শিলিগুড়ির ফাঁসিদেয়া এলাকায় ২৭ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে বেড়া নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। রাজ্যের প্রধান সচিব ও ভূমি বিভাগকে বাকি জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ৪৫ দিনের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এছাড়া নতুন সীমান্ত চৌকি ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্যও বিএসএফকে জমি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। অতীতে ভূমি অধিগ্রহণ ও প্রশাসনিক জটিলতা সীমান্ত সুরক্ষা প্রকল্পের অন্যতম বড় বাধা ছিল বলে মনে করা হয়।
তবে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পথে এখনো বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ১৯৭৫ সালের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তির ১৫০ গজ বিধিনিষেধ, বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের আপত্তি, নদী ও চরাঞ্চলের ভৌগোলিক জটিলতা এবং স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব—সব মিলিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত এখন ‘স্মার্ট ফেন্সিং’ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। ক্যামেরা, তাপ শনাক্তকারী সেন্সর, লেজার প্রযুক্তি, ড্রোন ও রাডার নজরদারির সমন্বয়ে সীমান্ত পর্যবেক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে সরকারিভাবেই স্বীকার করা হচ্ছে, শুধু প্রযুক্তি বা বেড়া নির্মাণের মাধ্যমে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি, অভিবাসন এবং সীমান্তবর্তী মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রার প্রশ্ন।
ফলে অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অবকাঠামো প্রকল্প সম্পন্ন করতে ভারত ধাপে ধাপে এগোনোর কৌশল নিয়েছে। তবে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার সীমান্ত এখনো বেড়াবিহীন থাকায় এবং আইনি ও ভৌগোলিক নানা বাধা অব্যাহত থাকায় পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: এনডিটিভি