তীব্র গ্যাস সংকটে সারা দেশ। শত শত শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কোথাও কোথাও বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাসের অভাবে রাজধানী ঢাকার প্রায় অর্ধেক এলাকায় চুলা জ্বলছে না। কক্সবাজারের মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগায় দৈনিক ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। টার্মিনালটি চালু না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট কাটবে না। এমনতিইে গ্যাস সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল দেশ। তার ওপর একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। মঙ্গলবার আগুনে টার্মিনালের বয়লারের বেশ ক্ষতি হয়েছে। ওইদিনই এটি বন্ধ হয়ে যায়। এটি কবে চালু হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন কোম্পানি এক্সিলেরেট। পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, আজ সকালে এটি চালু হবে কি না, তা এক্সিলেরেট জানাতে পারেনি। এমনকি কবে চালু হবে, তাও নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই সামনে গ্যাস নিয়ে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। একজন কর্মকর্তা জানান, এক্সিলেরেট তাদের হিউস্টনে অবস্থিত হেড অফিসে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করছে। যাতে সহজে টার্মিনালটি মেরামত করে চালু করা যায়। চালু থাকলে প্রতিদিন এই টার্মিনালকে ২ লাখ ২৮ হাজার ডলার চার্জ দেয় সরকার।
এদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাস না পেয়ে বুধবার দুপুরে রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন সিএনজিচালিত রিকশাচালকরা। গুলশান জোনের ট্রাফিকের ডিসি আনোয়ার সাইদ যুগান্তরকে বলেছেন, গ্যাস না পেয়ে আটোচালকরা রাস্তায় নেমেছিলেন। পরে বুঝিয়ে বলার পর বিকাল সাড়ে ৩টায় রাস্তা ছেড়ে দেন তারা। দেশে দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) হচ্ছে ১১০ কোটি ঘনফুট। একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ায় ১১০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে ৪৫-৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। যার কারণে এই সংকট।
আজ সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস। এলএনজি টার্মিনাল চালু না হলে সারা দেশের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানি সূত্র জানিয়েছে, গ্যাসের অভাবে বুধবার সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত কারখানায় কম গ্যাস সরবরাহ করা গেছে। অনেক এলাকা গ্যাস পায়নি। সাভারের শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ ছিল ১২ পিএসআই। শিল্পের জন্য এই চাপ কমপক্ষে ৪০-৫০ পিএসআই থাকা দরকার। আশুলিয়ায়ও একই অবস্থা।
ঢাকার তেজগাঁও এলাকার ফিলিং স্টেশন অল ইন ওয়ানে দেখা গেছে সিএনজি এবং কারের দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কোনো গ্যাস পাচ্ছেন না। একজন থ্রিহুইলারচালক জানান, আগে কম সময়ে গ্যাস পাওয়া যেত। এখন ২/৩ ঘণ্টায়ও পাওয়া যাচ্ছে না। মঙ্গলবার সকাল থেকে এ সমস্যা হচ্ছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা হোসনে আরা জানান, এলাকায় এমনিতে গ্যাস থাকে না। তবে বিকালে বা রাতে কিছু গ্যাস পাওয়া যেত। কিন্তু এখন তাও পাওয়া যাচ্ছে না। পেট্রোবাংলা, তিতাস এবং পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, গ্যাসের এমন সংকট ৪-৫ বছরে হয়নি। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে ২২০ কোটি ঘনফুটে। এর মধ্যে স্থানীয় গ্যাস ক্ষেত্র থেকে আসছে ১৬৬ কোটি ঘনফুট। অথচ ২০১৮-২০১৯ সালে স্থানীয় উৎস থেকেই গ্যাসের সরবরাহ ছিল ২৭০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট।
গ্যাস সরবরাহ কমে আসায় দেশের ৬টি বিতরণ কোম্পানিকে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে পেট্রোবাংলা। ২২০ কোটির মধ্যে তিতাস গ্যাস কোম্পানিকে ১২৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট, বাখরাবাদকে ১৯ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট, জালালাবাদকে ৩১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট, পশ্চিমাঞ্চলকে ১১ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট, কর্ণফুলীকে ২১ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানিকে ৭ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট গ্যাস বিতরণ করতে বলা হয়েছে। এই ২২০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট, সার খাতে ১৭ কোটি ঘনফুট, শিল্প এবং ক্যাপটিভে ৯৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট এবং অন্যান্য খাতে ৩২ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতদিন বিদ্যুৎ খাতে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পেলেও এখন পাচ্ছে তার চেয়েও কম। তাই বৃষ্টির মধ্যে বুধবার সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং হয়েছে। পাওয়ার গ্রিড অব কোম্পানির হিসাব অনুযায়ী, বুধবার বিকাল ৩টায় লোডশেডিং হয়েছে ৫৬৩ মেগাওয়াট।
গ্যাস সংকট নিয়ে বুধবার বিকালে জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী প্রেস বিফ্রিংয়ে বলেন, অনেক শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সিএনজি স্টেশন গ্যাস পাচ্ছে না। মূলত দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হলে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। সরকার গ্যাস সমস্যা সমাধানে কাজ করছে। এজন্য চতুর্থ টার্মিনাল স্থাপন এবং মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি আমদানির সম্ভাব্যতা যাচাই, ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনার জন্য পাইপলাইন বসানোর বিষয়টি পর্যালোচনা, নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার, উৎপাদন বাড়ানোর কার্যক্রম এবং জ্বালানি আমদানিসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ করছে জ্বালানি বিভাগ। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগামী দুই-একদিন লাগতে পারে টার্মিনালটি চালু করতে। আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। তবে সংকট তৈরির গুজব কেউ কেউ ছড়িয়ে দিচ্ছে।