সাগরে মাছ ধরায় ৫৮দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় হাতপাখায় জীবনের চাকা ঘুরছে শ্রী মহন জলদাসের। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা সময় তিনি হাতপাখা বানিয়ে বিক্রি করে থাকেন। তাঁর তৈরী করা হাতপাখা পৌর শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় তিনি সরবরাহ করেন।
শ্রী মহন জল দাস (৫৮) এর বাড়ি উপজেলার চর চান্দিয়া ইউনিয়নের বড় ফেনী নদী উপকূলীয় দক্ষিণ পূর্ব চর চান্দিয়ার জেলেপাড়া এলাকায়। সংসারে স্ত্রী ও চার ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তবে অভাবে কারনে ছেলে-মেয়েদেরকে পঞ্চম শ্রেণির বেশি লেখাপড়া করাতে পারেননি। মেয়েরা বাড়ির কাজ করলেও ছেলেরা নদীতে মাছ ধরে থাকে।
সরেজমিনে উপজেলার জেলেপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির ভেতরে ঘরের সামনে সড়কের পাশে বসে মহন জলদাস ও তার স্ত্রী স্বর্ণা রানী জল দাস হাতপাখা তৈরী করছেন। এই পাখা কিনছেন পথচারীরা। কেউ রিকশা থামিয়ে, কেউ মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে, আবার কেউবা হাঁটতে গিয়ে পাখা নেড়েচেড়ে দেখে দরদাম করে কিনছেন।
মহন জলদাস বলেন, তার কাছে কয়েক ধরনের পাখা রয়েছে। তালপাতা, বাঁশের চাটাই, কাপড়ের ওপর নকশাখচিত পাখা। কিছু পাখা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাতাস খাওয়া যায়। এর মধ্যে তালপাতা ও বাঁশের তৈরী পাখা বিক্রি বেশি। মানভেদে প্রতিটি পাখার দাম ১২০-২৫০ টাকা।
দীর্ঘ ৩০ বছরের পাখা বানানোর অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে মহন জল দাস বলেন, আমরা জেলে পরিবারের সন্তান। আমাদের আসল পেশা হচ্ছে নদীতে মাছ শিকার করা। কিন্তু স্ত্রীর কাছ থেকে শিখে গত ৩০ বছর ধরে নদী ও সাগরে যখনই সরকারিভাবে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়। তখনই বসে না থেকে বাঁশ, সুতা, কাপড়সহ হাতপাখা তৈরীর সরঞ্জাম কিনে এনে তারা স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে হাতপাখা বানানো শুরু করেন। এখনও নদী ও সাগরে ৫৮দিনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা চলছে। এসময়ে সরকারের সাহায্যের আশায় বসে না থেকে নিজের তৈরী করা ‘পাখা বিক্রি করেই আমার সংসারের জীবিকা চলছে। মাছ ও হাতপাখা বিক্রি করে তিনি অনেক আগে বাড়িতে ঘর করেছেন। অনেক জেলে সরকারিভাবে প্রনোদনার চাল পেয়েছেন। কিন্তু তালিকায় নাম না থাকায় তিনি পাননি। এতে তার সমস্যা হচ্ছে না, হাতপাখা বিক্রি করে সংসার ভালোই চলছে।’
মহন জল দাসের স্ত্রী স্বর্ণা রানী জলদাস বলেন, স্বামী ও ছেলেরা নদীতে মাছ শিকারে ব্যস্ত থাকলেও তিনি বছরের বারো মাসই হাতপাখা তৈরী করে ঘরে জমা রাখেন। গরমের মৌসুম শুরু হলে হাতপাখাগুলোকে ধুয়ে-মুচে পরিস্কার করে বিক্রি করেন। এই পাখা তিনি জেলেপাড়া, সোনাগাজী পৌরশহর ও জোরারগঞ্জ বাজার এলাকায় নিয়ে বিক্রি করে থাকেন। গত দেড় মাসে তারা প্রায় ২০০ হাতপাখা বিক্রি করেছেন। খরচ বাদ দিয়ে এতে তাঁদের প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকা আয় হয়েছে।
জেলেপাড়া এলাকায় ঘুরতে গিয়ে দেলোয়ার হোসেন দুটি তালপাতা ও একটি কাপড়ের নকশা করা পাখা কিনলেন। তিনি বলেন, ‘প্রচন্ড গরম। বিদ্যুৎ চলে গেলে অসহ্য গরমে টিকে থাকা দায়। তাই ৫৮০ টাকা দিয়ে তিনটি হাতপাখা কিনেছেন।’
চর খোন্দকার এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আগে তো এই হাতপাখাই ভরসা ছিল। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের কারনে মানুষের জীবনও পাল্টে গেছে। অভ্যাসও পরিবর্তন হয়েছে। তাই এখন হয়তো হাতপাখার খুব একটা প্রয়োজন হয় না। এরপরও তীব্র গরমে লোডশেড়িংয়ের কারনে গরম থেকে কিছুটা রক্ষা পেতে দুটি পাখা কিনলাম। বাড়িতে থাকলেই কাজে লাগবে।
জানতে চাইলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার পাল বলেন, শ্রী মহন জলদাস নিবন্ধিত জেলে হলেও তিনি নদীতে মাছ ধরেন। সমুদ্রগামী জেলে না হওয়ায় বন্ধের সময় সরকারি সহায়তার আওতায় তার নাম নেই। তবে বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য সযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।