স্প্যানিশ সংবাদপত্র মুন্দো দেপোর্তিভো-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদ্য ১৯ বছরে পা দেওয়া ইয়ামাল ইতোমধ্যেই অসংখ্য শিরোপায় ভরা নিজের অর্জনের তালিকায় বিশ্বকাপও যোগ করেছেন। ফলে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মান ব্যালন ডি'অর—জয়ের আরও কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।
স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ জিতে তিনি এক অসাধারণ মৌসুমের সমাপ্তি টেনেছেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকাদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তাঁর অল্প বয়সের প্রতিভা ফুটবল ইতিহাসেই বিরল। ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে এবং ইতালির জিউসেপ্পে বের্গোমিই কেবল তাঁর চেয়ে কম বয়সে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, এবং দুজনই নিজেদের দেশের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
ইয়ামালের সাফল্য শুধু বিশ্বকাপেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে তিনি স্পেনের হয়ে ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপও জিতেছেন, যেখানে তিনি টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার অর্জন করেন।
অল্প বয়সেই দলীয় ও ব্যক্তিগত সাফল্য
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই ইয়ামাল স্পেনের হয়ে ৩৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন তিনটি লা লিগা শিরোপা, দুটি স্প্যানিশ সুপার কাপ এবং একটি কোপা দেল রে।
এখন তাঁর সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো বার্সেলোনার হয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় করা।
ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও তিনি কোপা ট্রফি (বিশ্বের সেরা তরুণ খেলোয়াড়) এবং গোল্ডেন বয় পুরস্কার জিতেছেন, যা ইউরোপের সেরা তরুণ প্রতিভা হিসেবে তাঁর অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।
ব্যক্তিগতভাবে তিনি একটি দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়েছেন। ১৬টি গোল করে লা লিগার সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন এবং ফেরান তোরেসের সঙ্গে যৌথভাবে জাররা ট্রফি (লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা স্প্যানিশ খেলোয়াড়) জেতেন। পাশাপাশি তিনি ১১টি অ্যাসিস্টও করেন।
বার্সেলোনার হয়ে এখন পর্যন্ত ১৫১টি ম্যাচে তিনি ৪৯টি গোল করেছেন এবং ৪৪টি অ্যাসিস্ট দিয়েছেন। এত অল্প বয়সে এই পরিসংখ্যানই তাঁর অসাধারণ প্রভাবের প্রমাণ।
চোট নিয়েও বিশ্বকাপে উজ্জ্বল
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সময় ইয়ামালের বাঁ হাঁটুর টেনডনে চোট ছিল, যা তাঁর শারীরিক সক্ষমতাকে কিছুটা প্রভাবিত করে এবং ম্যাচের সংখ্যা সীমিত করে দেয়। তবুও তিনি স্পেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণভাগের অস্ত্র ছিলেন।
টুর্নামেন্ট যত এগিয়েছে, তাঁর পারফরম্যান্স তত উন্নত হয়েছে। তিনি সৌদি আরবের বিপক্ষে গোল করেন এবং সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে স্পেনের প্রথম গোলের জন্য যে পেনাল্টি আদায় হয়, সেটিও তাঁরই অবদান।
পরিসংখ্যানও তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দেয়। পুরো বিশ্বকাপে কেবল আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসিই ইয়ামালের চেয়ে বেশি সফল ড্রিবল করেছেন—মেসির ২৮টির বিপরীতে ইয়ামালের ছিল ২৭টি।
অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পে, মাইকেল অলিসে এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়র প্রত্যেকেই মাত্র ১৬টি সফল ড্রিবল করেছেন। এই ব্যবধানই প্রমাণ করে, পুরো টুর্নামেন্টে বার্সেলোনার এই উইঙ্গার কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
সামনে ব্যালন ডি'অর
২০২৬ সালের ব্যালন ডি'অর জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার এখন ইয়ামাল। এমনকি ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ব্যালন ডি'অরজয়ী হওয়ারও বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে তাঁর।
বর্তমানে এই রেকর্ড ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিওর দখলে। তিনি ১৯৯৭ সালে ২১ বছর ৯২ দিন বয়সে এই পুরস্কার জিতেছিলেন।
গত বছর ব্যালন ডি'অর দৌড়ে উসমান দেম্বেলের কাছে রানার-আপ হওয়া ইয়ামাল এবার বিশ্বকাপ ও লা লিগা শিরোপা এবং দুর্দান্ত ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের কারণে উল্লেখযোগ্য সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
স্পেন দলের অন্য সব খেলোয়াড়ের তুলনায় তাঁর পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে এগিয়ে। তবে স্পেনের একাধিক খেলোয়াড়ের মধ্যে ভোট বিভাজন তাঁর ব্যালন ডি'অর জয়ের সম্ভাবনায় কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও ইয়ামালের জন্য সুখবর আসতেই থাকে। তাঁর বাজারমূল্য ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশেষায়িত ওয়েবসাইট ট্রান্সফারমার্কটের সর্বশেষ মূল্যায়নে বার্সেলোনার ১০ নম্বর জার্সিধারী এই তারকা এবং নরওয়ের আর্লিং হলান্ড—দুজনেরই বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ২২ কোটি ইউরো, যা তাঁদের বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ফুটবলারদের কাতারে নিয়ে গেছে।
বর্তমানে দীর্ঘ ও সফল একটি মৌসুম শেষ করে ইয়ামাল গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটাচ্ছেন। তবে আরও বড় স্বপ্ন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে তিনি আবার বার্সেলোনায় ফিরবেন, নিজের অসাধারণ ফুটবল ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করতে।
এ পর্যন্ত তাঁর অর্জন নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। তবে এটি কেবল শুরু। যদি তিনি একই ধারায় নিজের উন্নতি অব্যাহত রাখতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সব সম্ভাবনাই তাঁর রয়েছে।