২০১৭ সালের ওই ঢলে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এরপর কক্সবাজারে গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থীশিবির। এরই মধ্যে রাখাইনে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ২০২৪ সাল থেকে আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে আগে থেকেই ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে চাপ আরও বেড়েছে।
বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচর মিলিয়ে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। এর মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে রয়েছেন ১১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৫ জন। আর নোয়াখালীর ভাসানচরে আছেন আরও ৩৩ হাজার ৬৫৯ জন।
নয় বছরেও প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে গত নয় বছরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো উদ্যোগই সফল হয়নি। ২০১৮ সালে প্রত্যাবাসন চুক্তি, পরবর্তী সময়ে তালিকা যাচাই এবং একাধিক দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার নিয়ে রোহিঙ্গাদের আস্থার সংকট কাটেনি।
এর মধ্যে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতিও আরও জটিল হয়েছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাতের কারণে সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াও কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
সংকটে নতুন প্রজন্ম
দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে বসবাসের কারণে রোহিঙ্গাদের জীবনেও নানা সংকট তৈরি হয়েছে। খাদ্য ও মানবিক সহায়তা কমে আসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং অপরাধ ও মানবপাচারের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটের প্রভাব পড়ছে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পরিবেশ ও অর্থনীতিতেও।
রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে নতুন প্রজন্ম। ক্যাম্পে প্রতিবছর প্রায় ৩ হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ক্যাম্পে জন্ম নিয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৪ শিশু। তাদের অনেকেরই মিয়ানমারের সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ স্মৃতি নেই।
ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত ও কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় এসব শিশু ও তরুণের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রজন্ম শরণার্থী পরিচয় নিয়েই বেড়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক চাপের আহ্বান
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির জন্য বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। ঢাকার অবস্থান হলো- নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি না হলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়।
নয় বছর পরও তাই রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান অধরাই রয়ে গেছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- কবে তারা নিরাপদে নিজ দেশে ফিরতে পারবেন এবং প্রত্যাবাসনের পর তাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, বসতভিটা ও মৌলিক অধিকার কতটা নিশ্চিত হবে।