শুনানি শেষে আদালত কক্ষের ভেতরেই উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে সোহেল রানা দাবি করেন, তিনি ধর্ষণ করেননি। সোহেল বলেন, ‘আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কাটছি। ধর্ষণ করেছে ডলার নামে একজন। আমি পাপ করছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেন।’
তিনি বলেন, আমারতো ডিএনএ টেস্ট করা হয়নি। তাহলে কিভাবে প্রমাণ হলো আমি ধর্ষণ করেছি? এসময় সোহেল জোর গলায় ডলারের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘মিরপুর-১১ নম্বরে ডলারের বাড়ি। ধর্ষণও ডলার করছে, মারছেও ডলার। ওরে ধরেন, সব পাবেন।’
সোহেল আরও বলেন, রামিসাকে এনে দিতে পারলে ডলার তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময়ও সাংবাদিকদের সামনে একই বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করেন।
একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, তার স্ত্রী তাকে পালাতে সাহায্য করেননি এবং তার কোনো দোষ নেই। সোহেলের ভাষ্য, ‘আমার দোষ আছে, ডলারেরও দোষ আছে। আমি শুধু বাচ্চাটাকে দুই টুকরো করেছি।’
তবে ডলারের নাম নিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পর্যন্ত তদন্তে এমন কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। এখন যদি এমন কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা সামনে আসে এবং সেটির আলামত পাওয়া যায় তবে মামলাটি নতুন মোড় নিতে পারে। এমনকি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরাও জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা সোহেলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এমন কোনো ব্যক্তির নাম নেই। ফলে বিচার শুরুর ঠিক আগে সোহেলের এই বক্তব্যকে অনেকেই আত্মপক্ষ সমর্থনের কৌশল হিসেবে দেখছেন।
অভিযোগ গঠন শেষে আদালত আগামীকাল (২ জুন) থেকে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর নির্দেশ দিয়েছেন।
সোমবার (১ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে মামলাটির অভিযোগ গঠন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এদিন সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে নিযুক্ত বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু অভিযোগ গঠনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ তদন্তের গতি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দুই আসামির অব্যাহতি চান। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতকে জানায়, ঘটনার দিন রামিসাকে কৌশলে বাসা থেকে ডেকে এনে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। নির্যাতনের একপর্যায়ে শিশুটি অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে মৃত মনে করে মরদেহ গুমের উদ্দেশে শরীর বিকৃত করা হয়।
বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু আদালতে বলেন, রামিসার মা তাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খুঁজতে গিয়ে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে আসামিদের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পেয়ে সন্দেহ হয়। আশপাশের মানুষ জড়ো হলেও ওই ফ্ল্যাটের দরজা না খোলায় সন্দেহ আরও বাড়ে। একপর্যায়ে জানালা দিয়ে রক্ত দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তখন দেখা যায়, প্রধান আসামি সোহেল রানা পালিয়ে গেছেন এবং স্বপ্না আক্তার ঘরের ভেতরে অবস্থান করছেন। পরে পুলিশ এসে তাকে আটক করে।
শুনানির সময় স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়ে শোনানো হলে বিচারক তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি নিজেকে দোষী মনে করেন কি না। জবাবে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা স্বামী সোহেল রানার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তুমি বলো আমি দোষী কি না’। এসময় সোহেল দাবি করেন, তার স্ত্রী নির্দোষ।
প্রধান আসামি সোহেল রানা ‘ডলার’ নামে এক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুললেও রাষ্ট্রপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে সেই দাবিকে গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। আসামিরা অনেক সময় আদালতের সহানুভূতি লাভের উদ্দেশে কিংবা নিজেদের দায় কমিয়ে দেখানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকেন।—পিপি ওমর ফারুক ফারুকী
পরে বিচারক এজলাস ত্যাগ করার পরও কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দুজনকে কথা বলতে দেখা যায়। সোহেল স্ত্রীকে সাহস দিয়ে বলেন, তার জবানবন্দিতেও স্বপ্নার কোনো সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়নি। কিছুক্ষণ পর পুলিশ স্বপ্নাকে হাজতখানায় নিয়ে গেলে তিনি স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং সোহেলও তাকে অভয় দেওয়ার চেষ্টা করেন।
ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, সোহেল রানা আদালতে যে ‘ডলার’ নামের ব্যক্তির কথা বলেছে, সে বিষয়ে তদন্তের সময় দেওয়া তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। সে যখন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়, তখন এমন কোনো ব্যক্তির নাম বলেনি, এমন কোনো বক্তব্যও দেয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনের কোথাও ‘ডলার’ নামের কারও সম্পৃক্ততার তথ্য নেই।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, পল্লবীর মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকতো দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তার। একই ভবনের অন্য একটি ফ্ল্যাটে সাবলেট ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার।
গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে তাকে কৌশলে ওই ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ। পরে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিশুটিকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে তার মা আসামিদের কক্ষের সামনে রামিসার স্যান্ডেল দেখতে পান। সন্দেহ হলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন স্থানীয়রা। তখন শোবার ঘরে রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ এবং বাথরুমের একটি বালতিতে তার বিচ্ছিন্ন মাথা পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন স্বপ্না আক্তার।
মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না আক্তার জানিয়েছিলেন, সোহেল রামিসাকে বাথরুমে আটকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন। পরে মরদেহ গোপনের উদ্দেশে মাথা বিচ্ছিন্ন করেন এবং জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান।
ঘটনার দিনই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। পুলিশ প্রথমে স্বপ্না আক্তারকে আটক করে এবং পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে। পরে সোহেল রানা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
মাত্র পাঁচদিনের তদন্ত শেষে গত ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর দ্রুত বিচারের লক্ষ্যে মামলাটি শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার এই নৃশংস ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে এবং দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছে। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলাটি এখন সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
এদিকে রামিসা হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছে।