ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাম্প্রতিক তালিকা অনুযায়ী, অন্তত ১৪৮ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী রাজধানীর চাঁদাবাজির সঙ্গে সরাসরি জড়িত, যারা বিভিন্ন এলাকায় ভয়ভীতি, দখল, হামলা ও ভাড়াটে খুনের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছে।
তারা ফুটপাত, বাজার, পরিবহনস্ট্যান্ড, ঝুট ব্যবসা, নির্মাণ প্রকল্প ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গুলশান, বাড্ডা, ভাটারা, রামপুরা ও মহাখালী এলাকায় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এসব চক্র। মেরুল বাড্ডার ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকায় দখল করে গড়ে ওঠা মাছের বাজার থেকেই প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
গুলশান ও বনানী এলাকার ফুটপাত, কাঁচাবাজার ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। চাঁদা না দিলে হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ ও হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। গুলশান ১, গুলশান ২ ও শাহজাদপুর এলাকায় ফুটপাতের দোকান থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হয় বলেও পুলিশের তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া গুলশান ও বনানীর বিভিন্ন স্পা সেন্টার থেকেও মাসিক চাঁদা আদায়ের তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
শুধু গুলশান-বাড্ডা নয়, ডেমরা, শ্যামপুর, ওয়ারী, কদমতলী, কামরাঙ্গীরচর, চকবাজার, সবুজবাগ, খিলগাঁও, পল্টন, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও পল্লবী এলাকাতেও অস্ত্রধারী চাঁদাবাজ চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কিছু এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, রাজধানীর এই চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে কয়েকটি আলোচিত সন্ত্রাসী গ্রুপ। এর মধ্যে রয়েছে জিসান গ্রুপ, কলিং মেহেদী গ্রুপ, রবিন-ডালিম-মাহবুব গ্রুপ, সুব্রত বাইন বাহিনী ও মোল্লা মাসুদের নেটওয়ার্ক। এদের অনেক নেতা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করলেও সেখান থেকেই বাহিনী পরিচালনা করছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র।
পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, জিসান গ্রুপের সদস্যরা গুলশান, বাড্ডা, ভাটারা রামপুরা ও মহাখালী এলাকায় সক্রিয়। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদের বাহিনীও এসব এলাকায় সক্রিয়। একইভাবে কলিং মেহেদী গ্রুপ বাড্ডা, গুলশান ও মহাখালী এলাকায় দখলবাজি ও ভাড়াটে খুনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কলিং মেহেদী গ্রুপের প্রধান মেহেদী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে রবিন-ডালিম-মাহবুব গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে বাড্ডা, গুলশান ১, গুলশান ২ ও শাহজাদপুর এলাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে।
পুলিশের ভাষ্য, এই গ্রুপের শীর্ষ নেতারা বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করলেও তাদের সদস্যরা দেশে চাঁদাবাজি, দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
বাড্ডা এলাকায় চঞ্চল গ্রুপ নামে আরেকটি সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে, যার প্রধান চঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে। পুলিশের ধারণা, চঞ্চল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
এছাড়া রাজধানীর ডেমরা, শ্যামপুর, ওয়ারী, কদমতলী, কামরাঙ্গীরচর, চকবাজার, শাহজাহানপুর, সবুজবাগ, পল্টন, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও হাজারীবাগ এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে পৃথক সন্ত্রাসী গ্রুপ।
তাদের মধ্যে অন্যতম—ধানমন্ডি ও হাজারীবাগের ইমন গ্রুপ, মোহাম্মদপুরের পিচ্চি হেলাল গ্রুপ।
শাহজাহানপুর, লালবাগ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও পল্লবী থানা এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি অস্ত্রধারী গ্রুপ।
এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজদের ধরতে অভিযান শুরু করেছে ডিএমপি।
পুলিশ জানিয়েছে, মে মাসের প্রথম ছয় দিনেই ১৪৫ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও তাদের ২৫৬ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।