রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Channel18

অর্থনীতি

পেন্ডুলামে ঝুলছে বিশ্ব অর্থনীতি, বড় ঝড়ের ঘনঘটা

পেন্ডুলামে ঝুলছে বিশ্ব অর্থনীতি, বড় ঝড়ের ঘনঘটা

এখনো বড় বিপর্যয় এড়িয়ে কোনোমতে টিকে আছে বিশ্ব অর্থনীতি। যুদ্ধ, জ্বালানিসংকট ও বাণিজ্যবিরোধের মধ্যেও প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রেখেছে প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ, মজুত তেলের ব্যবহার এবং বিভিন্ন দেশের নীতিগত সহায়তা। কিন্তু এই প্রতিরোধের শক্তি ক্রমেই কমছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সতর্কতা ও অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন বলছে, বর্তমান স্থিতি দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।

ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের মধ্যে প্রকাশিত অক্টোবরের বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে চলতি বছরের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশ ধরা হয়েছে। আগামী বছর তা ৩ দশমিক ৪ শতাংশে উঠতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি এ বছর বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছানোর এবং পরের বছর ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামার পূর্বাভাস রয়েছে।

এই হিসাব আপাত স্বস্তির হলেও ঝুঁকিগুলো একসঙ্গে কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম উঁচু থাকতে পারে। নতুন বাণিজ্যবিরোধ, সরকারি ঋণের সুদ বৃদ্ধি এবং এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বদলে যাওয়াও অর্থনীতিতে ধাক্কা দিতে পারে। সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছে প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থার বাইরে থাকা জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো।

গার্ডিয়ানে সম্প্রতি প্রকাশিত কলামে অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিক ল্যারি এলিয়ট এই পরিস্থিতিকে সংকট স্থায়ীভাবে এড়ানোর পরিবর্তে কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, অর্থনীতির অপ্রত্যাশিত সহনশীলতার পেছনে রয়েছে এআইয়ে বিনিয়োগ, মজুত থেকে তেলের সরবরাহ এবং চীনের সস্তা পণ্য রপ্তানি। কিন্তু প্রতিটি সহায়তার সঙ্গেই নতুন দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে।

জ্বালানির ক্ষেত্রে মজুত ব্যবহারের ভূমিকা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানিয়েছে, মার্চে নেওয়া সম্মিলিত উদ্যোগের আওতায় ৭ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ৩২ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়া হয়েছে। তখনো প্রতিশ্রুত প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল ছাড়ার বাকি ছিল। ডিজেলের বাজারে চাপ বিবেচনায় সদস্যদেশগুলো মজুত ছাড়ার কাজ দ্রুত শেষ করার পক্ষে অবস্থান নেয়।

মজুত কমলেও জরুরি সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ এখনো রয়ে গেছে। একই বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, সদস্যদেশগুলোর সরকারি জরুরি মজুতে তখনো প্রায় ১১০ কোটি ব্যারেল তেল ছিল। প্রয়োজন হলে আরও ছাড়ার প্রস্তুতিও রয়েছে। এই মজুত তাৎক্ষণিক সরবরাহসংকট সামলায়; দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যে নিয়মিত উৎপাদন ও সরবরাহের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না।

এআইয়ের বিনিয়োগও একই সঙ্গে শক্তি ও ঝুঁকির উৎস। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রধান অর্থনীতি ভাষ্যকার মার্টিন উলফ ১৫ অক্টোবরের বিশ্লেষণে লিখেছেন, প্রবৃদ্ধি আর স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি এক বিষয় নয়। তাঁর মতে, এআই সফল হলেও বিনিয়োগের বৃদ্ধির গতি একসময় থামতে বা কমতে পারে। আবার প্রত্যাশামতো আর্থিক সুফল না এলে শেয়ারবাজার ও বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই সংশোধনের ঝুঁকি থাকবে।

উলফের বিশ্লেষণে আরেকটি দুর্বলতা সরকারি অর্থব্যবস্থা। মহামারির পর সুদের হার বাড়লেও বড় অর্থনীতিগুলোর অনেকেই সুদ পরিশোধের আগের হিসাবেও বাজেট ঘাটতি চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন ধাক্কা এলে সহায়তা দেওয়ার সামর্থ্য সীমিত হতে পারে। ঋণ পুনঃঅর্থায়নের সময় বাড়তি সুদ শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা অবকাঠামোর জন্য বরাদ্দের ওপরও চাপ তৈরি করে।

আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, বারবার ধাক্কা সামলালেও বিশ্ব অর্থনীতির সহনশীলতা সীমায় পৌঁছাচ্ছে। জ্বালানি ও রাজস্বনীতির সুরক্ষা কমছে এবং অনেক জায়গায় মূল্যস্ফীতি উঁচু রয়েছে। তাঁর মূল্যায়নে, এআইয়ের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অর্থনীতি সুবিধা পাচ্ছে; বিপরীতে নিম্ন আয়ের, সংঘাতপীড়িত ও জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সরকারগুলোর জন্য এখানেই কঠিন রাজনৈতিক সমীকরণ। ঋণ ও ঘাটতি সামলাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চাপ বাড়ছে, অথচ জীবনযাত্রার খরচে বিপর্যস্ত মানুষ আরও সহায়তা চান। এলিয়টের আশঙ্কা, এই অবস্থায় কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন জনঅসন্তোষ বাড়াতে পারে। চীনের কম দামের পণ্য আমদানি মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সাহায্য করলেও পশ্চিমা উৎপাদন খাতে চাকরি হারানোর উদ্বেগ তৈরি করছে।

সরকারি সহায়তার সীমা নিয়ে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সেপ্টেম্বরের জরিপেও সতর্কতা রয়েছে। অংশগ্রহণকারী প্রধান অর্থনীতিবিদদের ৬৯ শতাংশ মনে করেন, ২০২০ সালের পর অর্থনীতির সহনশীলতায় রাজস্ব সহায়তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আগামী বছরে একই ভূমিকা থাকবে বলে মনে করেন মাত্র ২৮ শতাংশ। আবার ৫৬ শতাংশ বিশ্ব পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকা বা উন্নতির আশা করেছেন।

পরিবারগুলোর জন্য চাপের জায়গাটিও ওই জরিপে স্পষ্ট। অংশগ্রহণকারীদের ৮৮ শতাংশ খাদ্য, ৮৩ শতাংশ বিদ্যুৎ এবং ৭৭ শতাংশ পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা করেছেন। অধিকাংশ অঞ্চলে প্রকৃত আয় স্থির থাকা বা কমার প্রত্যাশাও রয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক সংখ্যার মধ্যেও মানুষের কেনার ক্ষমতা চাপে থাকতে পারে। এই ব্যবধান দীর্ঘ হলে সরকারের কাছে সহায়তার দাবি বাড়তে পারে, অথচ ঋণের ব্যয় মেটাতে গিয়ে সহায়তার সামর্থ্য সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে।

অর্থাৎ বিপর্যয় অনিবার্য, এমন পূর্বাভাস নেই। কিন্তু জরিপে প্রায় সবাই ভূরাজনৈতিক সংঘাতকে অনিশ্চয়তার উৎস হিসেবে দেখেছেন। আইএমএফও বলছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লে সরকারকে সবচেয়ে অসহায় মানুষের জন্য সাময়িক ও লক্ষ্যভিত্তিক আয়সহায়তা দিতে হবে। সবার জন্য দাম চেপে রাখার ব্যবস্থায় একই সুরক্ষা দিতে অনেক বেশি সরকারি অর্থ প্রয়োজন হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ঘাটতিকেও বড় বাধা মনে করছেন এলিয়ট। তাঁর যুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার সময় রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন, কিন্তু সংরক্ষণবাদ এবং বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা সেই পথ কঠিন করছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব বদলালেই এই কাঠামোগত সংকট দূর হবে, এমন ধারণার সঙ্গেও তিনি একমত নন।

এখন প্রধান প্রশ্ন, অর্থনীতি আর কত দিন এই ভারসাম্য ধরে রাখতে পারবে। যুদ্ধ কমলে জ্বালানির চাপ হালকা হতে পারে, এআইয়ের উৎপাদনশীলতা বাড়লেও স্বস্তি মিলতে পারে। কিন্তু সংঘাত, ঋণের চাপ ও বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা একসঙ্গে বাড়লে বর্তমান প্রতিরোধ দ্রুত দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আপাত শান্তির আড়ালে বড় ঝড়ের আশঙ্কা তাই কাটছে না।

আরও

অর্থনীতির ধীরগতিতে নতুন করে ২১ লাখ মানুষ দরিদ্র

অর্থনীতি

অর্থনীতির ধীরগতিতে নতুন করে ২১ লাখ মানুষ দরিদ্র

অর্থনীতির ধীরগতির প্রভাব পড়েছে মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও জীবিকায়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে দেশে নতুন করে প্রা...

২০২৬-১০-০৬ ১৩:১৫

নিত্যপণ্য ও এলপি গ্যাসের বাজারে অভিযান : ১০২ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা

অর্থনীতি

নিত্যপণ্য ও এলপি গ্যাসের বাজারে অভিযান : ১০২ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা

ফল, ভোজ্যতেল ও ডিমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি ন...

২০২৬-১০-০৪ ২২:৩০

১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল ২৫২ টাকা, নতুন দাম ১,৮৩৭

অর্থনীতি

১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল ২৫২ টাকা, নতুন দাম ১,৮৩৭

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অক্টোবর মাসের জন্য ১২ কেজি...

২০২৬-১০-০৪ ১৬:৩৯

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তাই নতুন স্বাভাবিক অবস্থা: অর্থমন্ত্রী

অর্থনীতি

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তাই নতুন স্বাভাবিক অবস্থা: অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তাই এখন নতুন স্বাভাবিক অবস্থা। তিনি বলেন,...

২০২৬-১০-০৩ ২২:২৬