প্রথম ধাপে ছয়টি ব্যক্তি ও শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে দেওয়ানি কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন গ্রুপ এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদ।
এসব পক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণের পরিমাণ আনুমানিক ১২ বিলিয়ন ডলার। এটি ঋণের হিসাব, পুরো অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে কিংবা উদ্ধারযোগ্য সম্পদের পরিমাণও সমান—এমন সিদ্ধান্ত এই অঙ্ক থেকে পাওয়া যায় না। সম্পদের অবস্থান ও মালিকানা যাচাই করেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
ব্যাংকগুলো পৃথকভাবে কাজ করার পরিবর্তে সম্মিলিত উদ্যোগ বা কনসোর্টিয়াম গঠন করেছে। ছয়টি কনসোর্টিয়ামের নেতৃত্বে রয়েছে আটটি ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও আইনি কার্যক্রম সমন্বয় করবে নেতৃত্বে থাকা ব্যাংকগুলো।
প্রস্তাবিত মডেলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব অর্থায়নে সম্পদ অনুসন্ধান ও আইনি কাজ করবে। সফলভাবে উদ্ধার করা সম্পদের একটি অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে তারা। এতে ব্যাংকগুলোর অগ্রিম ব্যয়ের চাপ কমবে। তবে সম্পদ উদ্ধার কত দিনে হবে কিংবা কত অর্থ ফেরত আসবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়।
এ পর্যন্ত ১০টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গোপনীয়তা চুক্তি ও নিয়োগসংক্রান্ত প্রাথমিক নথি সম্পাদনের কাজ চলছে। কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগসংক্রান্ত চিঠি সই হলেও বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পন্ন করার ধাপ বাকি রয়েছে।
ফৌজদারি তদন্তে অবৈধ সম্পদের উৎস, অর্থ স্থানান্তরের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে দেওয়ানি কার্যক্রমে বিদেশে থাকা বাড়ি, ফ্ল্যাট, ব্যবসায়িক স্বার্থ, বিনিয়োগ ও ব্যাংক হিসাব শনাক্ত করে ব্যাংকের পাওনা আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বাধীন সম্পদ পুনরুদ্ধার টাস্কফোর্স এ উদ্যোগ সমন্বয় করছে। সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। দুদক, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গোয়েন্দা সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এতে যুক্ত রয়েছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা মূল্যের দেশি-বিদেশি সম্পদ সংযুক্ত, জব্দ বা অবরুদ্ধ করার আদেশ ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশে স্থাবর সম্পদ প্রায় ১৫ হাজার ১২৪ কোটি এবং অস্থাবর সম্পদ প্রায় ৪ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকার।
তবে এসব আদেশের অর্থ সম্পদ বিক্রি করে অর্থ ইতিমধ্যে দেশে ফেরত আনা হয়েছে—এমন নয়। বিদেশে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং সম্পদের ওপর বাংলাদেশের দাবি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
পাশাপাশি ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে, এমন আরও ৪২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজে আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে সম্পদ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, প্রথমে সম্পদের অবস্থান, ধরন ও মূল্য শনাক্ত করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আইনে জব্দ বা অবরুদ্ধ এবং আদালতের নির্দেশে বিক্রি বা নিষ্পত্তির মাধ্যমে অর্থ ফেরানোর প্রক্রিয়া এগোবে।
বিদেশি সহযোগিতা পেতে ১৬টি বিচারব্যবস্থার কাছে ৩০টি পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের যৌথ স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ইনিশিয়েটিভসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে। সম্পদ শনাক্ত, প্রমাণ সংগ্রহ ও বিদেশি আদালতে দাবি প্রতিষ্ঠার কারণে পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। সূত্র: জাগো নিউজ