তবে এ আগ্রহকে শুধু আস্থার চোখে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বড় বাজার, তরুণ জনশক্তি, জলবায়ু ঝুঁকি ও উন্নয়ন সম্ভাবনার পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, কম রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং ঋণের বোঝাও উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্বেগের জায়গা। অর্থায়নের সঙ্গে তাই সংস্কারের চাপও বাড়ছে।
২০২৩ সালে শুরু হওয়া পুরোনো আইএমএফ কর্মসূচির কিস্তি ছাড় এখন আর সম্পর্কের মূল বিষয় নয়। নতুন সরকার নতুন অর্থায়ন কর্মসূচি চেয়েছে। জুনে আইএমএফ সেই অনুরোধের কথা জানায়। ১২ থেকে ১৬ জুলাই তাদের একটি দল ঢাকা সফর করে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সংস্কারের অগ্রাধিকার পর্যালোচনা করে।
আইএমএফ বলছে, ২০২৩ সালের তুলনায় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং অত্যন্ত কম রাজস্ব আহরণকে তারা নতুন কর্মসূচির কেন্দ্রীয় সমস্যা হিসেবে দেখছে। ফলে নতুন অর্থায়ন শুধু রিজার্ভে ডলার যোগ করবে না; রাজস্ব, ব্যাংক, ভর্তুকি, বিনিময় হার ও আর্থিক খাত সংস্কারের চাপও বাড়াবে।
একই ধারা বিশ্বব্যাংকের ক্ষেত্রেও। গত ২৪ জুন ব্যাংক খাত শক্তিশালী করতে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে সংস্থাটি। লক্ষ্য আমানত সুরক্ষা জোরদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারের ভিত্তি তৈরি।
এডিবিও অর্থায়ন বাড়াচ্ছে। মে মাসে সংস্থাটির প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরে ২০২৬ সালের কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি হয়। মাঝারি মেয়াদে বাংলাদেশে বার্ষিক সার্বভৌম ঋণ প্রতিশ্রুতি প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে বাড়ানোর পরিকল্পনাও জানায় সংস্থাটি।
পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগে পাঁচ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ ঘোষণা করেছে।
তবে এডিবির অর্থ শুধু অবকাঠামোয় নয়; রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগ পরিবেশ, বাণিজ্য সুবিধা ও ব্যাংক খাত সংস্কারেও যাচ্ছে। চলতি বছর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন সংস্কারে ৭৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তার প্রস্তাব রয়েছে।
জাপানও একই ধারায়। জুনে জাইকা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি সরবরাহে সর্বোচ্চ ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের ঋণ চুক্তি করেছে। কর্মসূচিটি এডিবির অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বিত।
এত ঝুঁকি সত্ত্বেও উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহের পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের বাজার, বড় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ রাখছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, পানি ব্যবস্থাপনা, নগরায়ণ ও সবুজ জ্বালানিতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন।
আরেকটি কারণ এলডিসি উত্তরণ। বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ ২৪ নভেম্বর ২০২৬ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়ার কথা। তবে প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। উত্তরণের পর বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা ও সহায়তার ধরন বদলাবে। তাই দীর্ঘ সময় রেয়াতি ও প্রয়োজনভিত্তিক অর্থায়ন ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। কিন্তু নতুন অর্থায়নের দরজা খোলার সময়ই পুরোনো ঋণের চাপ দ্রুত বাড়ছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হিসাবে জুলাইয়ে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ পেয়েছে ১৮০ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার, বিপরীতে আসল ও সুদ মিলিয়ে পরিশোধ করেছে ৪৫৩ দশমিক ২৩ মিলিয়ন ডলার। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ হয়েছে ২ দশমিক ০৪৭৬ বিলিয়ন ডলার।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশীয় ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি এবং বিদেশি ঋণের ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আইএমএফের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ জিডিপির প্রায় ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ এখনো ‘মাঝারি’ ঋণঝুঁকিতে থাকলেও রাজস্বের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপকে বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইএমএফের সতর্কতাও কঠিন। জানুয়ারিতে সংস্কার বাস্তবায়িত হলে মাঝারি মেয়াদে প্রায় ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখালেও জুলাইয়ে সংস্থাটি বলেছে, রাজস্ব ও ব্যাংক খাতে সিদ্ধান্তমূলক সংস্কার না হলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে এবং মাঝারি মেয়াদে ৩ শতাংশের নিচেও থাকতে পারে।
সামনের সময়ে তিনটি পরিবর্তন স্পষ্ট হতে পারে: অনুদানের চেয়ে ঋণ ও নীতিনির্ভর অর্থায়ন বাড়বে; ঋণের পরিমাণের চেয়ে ঋণের মান ও পরিশোধ সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হবে; আর সরকারি ঋণের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ টানতে দাতা অর্থকে সেতু হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন সহযোগীদের নতুন অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করলেও মূল পরীক্ষা হবে সেই অর্থের ব্যবহার এবং সংস্কার বাস্তবায়ন।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের বিশ্লেষণ, দুর্বল রাজস্ব আহরণের বিপরীতে সরকারি ব্যয় ও ঋণনির্ভরতা বাড়ায় বাংলাদেশের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে। তাঁর হিসাবে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়বে। এ অবস্থায় শুধু নতুন ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ নেই; রাজস্ব বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, নতুন আইএমএফ কর্মসূচিতেও পুরোনো সংস্কারের প্রশ্নগুলো ফিরে আসবে। রাজস্ব, ব্যাংক খাত, বিনিময় হার ও জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে আইএমএফ সময় দিতে পারে, কিন্তু সংস্কার এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বৈদেশিক ঋণের প্রবাহের চেয়ে ঋণ পরিশোধ বেড়ে যাওয়াকে সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ নতুন অর্থায়নের অঙ্ক নয়, ঋণ নিয়ে অর্থনীতি কতটা আয় ও পরিশোধ সক্ষমতা তৈরি করছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।