কিন্তু জয় পাওয়ার পরও তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি থামতে চাননি। তিনি ইরাকের শাসক সাদ্দামকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছিলেন। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দিচ্ছিল। রুহুল্লাহ খামেনি চেয়েছিলেন, ভবিষ্যতের শত্রুরা যেন বুঝতে পারে–ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ালে বড় মূল্য দিতে হবে।
ইরাকের সঙ্গে সেই যুদ্ধ আধুনিক ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনেও বড় প্রভাব ফেলে। রুহুল্লাহ খামেনির সিদ্ধান্তের কারণে যুদ্ধ চলে আরও ছয় বছর। এই দীর্ঘ ও ভয়াবহ যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হন। আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলোর একটি ছিল এটি। বহু বছর পর এখন আবারও ইরানের সামনে একই ধরনের প্রশ্ন–যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, নাকি সমঝোতায় যাবে?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলেছে, যারা সেই সময় ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারাই এখন তেহরানের ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে আছেন। তাদের কাছে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধও ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের মতোই চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ। তাদের ধারণা, এই যুদ্ধে কে বেশি শক্তিশালী, সেটি মূল বিষয় নয়। বরং কে বেশি সময় টিকে থাকতে পারে, সেটিই ফল নির্ধারণ করবে।
অন্যদিকে, ইরানের তুলনামূলক মধ্যপন্থী একটি অংশ মনে করছে, আলোচনার মাধ্যমে ইরান ইতোমধ্যে যে কিছু সুবিধা পেয়েছে, সেগুলোর ভিত আরও শক্ত করার সুযোগ এসেছে। তবে এই আলোচনা এখনো খুব বেশি এগোয়নি।
ছয় মাস ধরে যুদ্ধ চলার পরও কোনো সমাধান হয়নি। এতে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার ভেতরে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। আর দেশটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে এখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
যুদ্ধের পর শান্তির পথ
ইরানের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী প্রকাশ্যে দাবি করছে, এই যুদ্ধে ইরান জয়ী হয়েছে। তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য ‘জয়’ আসলে কেমন হবে, তা নিয়ে ইরানের মধ্যে গভীর মতবিরোধ রয়েছে।
একদিকে আছেন বাস্তববাদী ও অভিজ্ঞ প্রশাসকরা। তাদের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
তারা যুদ্ধের একটি চূড়ান্ত সমঝোতা চান। তাদের যুক্তি হলো, যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ দেশটির ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তারা প্রকাশ্যে সতর্ক করে বলেছেন, শক্ত অবস্থান থেকে যুদ্ধ শেষ করার সুযোগ দ্রুত কমে আসছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৪৭ বছরের বিরোধের অবসান ঘটানোই ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায়। এতে বিশ্ব থেকে ইরানের বিচ্ছিন্নতাও কমবে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে থাকার সুযোগ পাবে।
চলতি মাসে পেজেশকিয়ান বলেন, “যুদ্ধ একসময় শেষ করতেই হবে। আমরা এখন শক্তিশালী ও মর্যাদার অবস্থানে আছি এবং পুরো বিশ্ব আমাদের জয় স্বীকার করছে। তাই এখনইদ যুদ্ধ শেষ করা ভালো।”
অন্যদিকে রয়েছে কট্টরপন্থী রক্ষণশীলরা। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রচণ্ড অবিশ্বাস করে। তাদের ভাষ্য, ওয়াশিংটন ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করতে চায়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তারা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে সতর্ক করে আসছে। ট্রাম্পের যুদ্ধ তাদের সেই অবস্থানকেই শক্ত করেছে।
কট্টরপন্থীরা বর্তমান সরকারের কর্মকর্তাদের ‘পশ্চিমাপন্থী’ বলেও অভিযুক্ত করে। তাদের দাবি, এসব কর্মকর্তা দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে অতিরঞ্জিত করে জনগণকে সমঝোতার পক্ষে নিতে চাইছেন।
লন্ডনের থিংকট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল সিএনএনকে বলেন, কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রকে অত্যন্ত অবিশ্বাসযোগ্য মনে করে। ট্রাম্পের কারণে তারা বহুবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই তাদের ধারণা, এবারও একই ঘটনা ঘটবে।
এই বিশ্লেষকের মতে, কট্টরপন্থীদের কাছে যুদ্ধে হেরে না যাওয়াটাই এক ধরনের জয়। তারা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ভালো একটি চুক্তি আদায় করতে চায় না, দেশের ভেতরেও নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর প্রভাব ধরে রেখে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে চায়। তারা পেজেশকিয়ানকে দুর্বল প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় কট্টরপন্থী পূর্বসূরি মারা যাওয়ার পর অনেকটা হঠাৎ করেই পেজেশকিয়ান প্রেসিডেন্ট হন।
জুনে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ট্রাম্পের পাশে পেজেশকিয়ানের সই কট্টরপন্থীদের কাছে তাকে আরও অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। এখন তারা দেশের ভেঙে পড়া অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যর্থ সমঝোতার দায়ও তার ওপর চাপাচ্ছে।
ইরানের অভ্যন্তরে বিভাজন এতটাই গভীর যে কট্টরপন্থীরা সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়ানোর অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, ক্লান্ত ও চাপে থাকা জনগণকে সমঝোতা মেনে নিতে বাধ্য করার জন্যই এমন করা হচ্ছে।
কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, সরকার ইচ্ছা করে জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে, যাতে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা ছাড়া আর কোনো পথ না থাকে। অনেকে আরও গুরুতর অভিযোগ করে বলছেন, মধ্যপন্থীরা অভ্যুত্থানের চেষ্টা করছে।
কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ-মানান রাইসি বলেন, “অর্থনীতির দিক থেকে আমরা কি সত্যিই কোনো সমাধানের পথ পাচ্ছি না? নাকি আপনারাই পরিস্থিতিকে এমন মনে করাচ্ছেন? সবকিছুর দায় যুদ্ধের ওপর চাপানো হচ্ছে, অথচ সব সমস্যাই যুদ্ধের কারণে হয়নি।”
কট্টরপন্থীরা কী চায়?
সিএনএন বলছে, কট্টরপন্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অতীতের ব্যর্থ চুক্তিগুলোর উদাহরণ দিচ্ছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে করা ইরানের পরমাণু চুক্তিও রয়েছে, যা পরে ট্রাম্প বাতিল করে দেন। আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র দুইবার ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়টিও তারা তুলে ধরছে।
এই গোষ্ঠী মনে করে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র দীর্ঘদিন টিকে থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দাবি, আঞ্চলিক সশস্ত্র মিত্রদের সমর্থন, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং শিয়া ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নীতি দেশকে ‘পশ্চিমাপন্থী’ রাজনীতিকদের কূটনীতির চেয়ে বেশি নিরাপত্তা দিয়েছে।
সানাম ভাকিল বলেন, কট্টরপন্থীরা মনে করেছে ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হবে না। তাই তারা এখন দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তাদের ধারণা, সময় গড়ালে ট্রাম্পও দুর্বল হয়ে পড়বেন। অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘায়িত করে কট্টরপন্থিরা ট্রাম্পকে ক্লান্ত করে তুলতে এবং সময় নিজেদের পক্ষে নিতে চায় বলে মত এই বিশ্লেষকের।
এক কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার ইরানের পার্লামেন্টে কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা কামরান গাজানফারি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনীতির পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা জনগণকে একটি চুক্তি ও ‘অপমানজনক শান্তি’ মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করতে চাইছেন। তিনি বলেন, “আমরা শত্রুকে যতই ছাড় দিই বা তাদের সামনে যতই পিছু হটি না কেন, তারা কখনো সন্তুষ্ট হবে না। তারা একের পর এক নতুন দাবি জানাতে থাকবে। ইরানের পুরোপুরি আত্মসমর্পণ ছাড়া তারা কিছুতেই সন্তুষ্ট হবে না।”
‘ট্রাম্প কোনো সাহায্য করছেন না’
ইরানের বাস্তববাদী নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কঠিন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যেই ট্রাম্পের অনিশ্চিত নীতি এবং তিনি সম্ভাব্য কোনো চুক্তি মেনে চলবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ বেড়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার বিরুদ্ধে কট্টরপন্থীদের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে।
সানাম ভাকিল বলেন, “ট্রাম্প কোনো সাহায্য করছেন না। একদিকে তিনি বলেন, তিনি ইরানকে আবার শক্তিশালী করতে চান। আবার পরের টুইটেই ইরানকে হুমকি দেন। এতে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সন্দেহ আরও বেড়ে যায়।”
রক্ষণশীলদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন, যাদের সংবাদপত্র, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম, রাস্তায় বিক্ষোভকারী এবং সামরিক বাহিনীর কিছু অংশের ওপর প্রভাব রয়েছে।
ভাকিল বলেন, তারা মনে করে ট্রাম্প কূটনীতিকে ব্যবহার করে ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আরেকটি সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের বিশ্বাস, ট্রাম্পের সঙ্গে ইরান যতবার কূটনীতির পথে গেছে, ততবারই ট্রাম্প তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
সিএনএনের ভাষ্য, এই মতবিরোধের মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নীরব রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, অনির্ভরযোগ্য ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে কোনো একটি পক্ষ নিলে তার নিজের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে তিনি যখন নিজের নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
শুক্রবার মোজতবা খামেনি চাপের মধ্যে সরকারের কাজের প্রশংসা করেন। তবে তিনি কর্মকর্তাদের দেশের দুর্বলতাগুলো সমাধানের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে এসব দুর্বলতা প্রকাশ্যে বেশি আলোচনা না করারও পরামর্শ দেন। এতে ইরানের শত্রুরা উৎসাহিত হতে পারে এবং মিত্ররা হতাশ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
এদিকে কট্টরপন্থীদের থামানোর মতো কেউ না থাকায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
নিজ দেশের বিরোধীদের উদ্দেশে গাজানফারি বলেন, “আমাদের শহীদ ইমাম (আলি খামেনি) তাদের বহুবার সতর্ক করেছিলেন। তারা কেন বুঝতে পারছে না? তারা এমনভাবে কথা বলছে, যাতে শুধু আত্মসমর্পণ আর পরাজয়ের কথাই মনে হয়।”