অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া বছরের অন্যান্য দিন কলেজ খোলা থাকার কথা থাকলেও নিয়মিত কলেজ খোলা হয় না। পরীক্ষার সময় ফরম পূরণের জন্য কলেজ খোলা হয়। ফরম পূরণের সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া কলেজের পরিচালনা কমিটি দীর্ঘদিন ধরে পরিবর্তন করা হয়নি। কমিটির মেয়াদ তিন বছর হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গঠিত কমিটিই এখনো দায়িত্বে রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করায় অনেকে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ফুরসন্ধি ইউনিয়নের বামনআইল গ্রামের কানাই বিশ্বাসের অভিযোগ, তাঁর কাছে অতিরিক্ত টাকা দাবি করায় তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে।
কানাই বিশ্বাস জানান, ২০১৯ অথবা ২০২০ সালে ভর্তির সময় প্রভাষক মোহিত কুমার সাহা তাঁর কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা নেন। পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় নেন ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা। এ ছাড়া প্রতি বছর ভর্তির জন্য ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হতো। এসব অর্থের কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। কানাই বিশ্বাসের অভিযোগ, তাঁর পিসির ছেলে অরূপ মজুমদারের কাছ থেকেও প্রচুর টাকা নিয়েছেন মোহিত কুমার সাহা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাষক মোহিত কুমার সাহা বিভিন্ন সময় চাপ দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা তুলে অধ্যক্ষকে দেন। বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, মোহিত কুমার সাহা ও বাবুল হোসেনের মধ্যে এসব টাকা ভাগাভাগি হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কলেজের ৭১ শতক জমিতে বর্গা চাষের মাধ্যমে পাওয়া অর্থ কলেজের তহবিলে জমা দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কলেজের সময়সূচি অনুযায়ী, রবিবার সকাল আটটা থেকে দুপুর দুইটা অথবা সকাল ১০টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত এবং বৃহস্পতিবার কলেজ খোলা থাকার কথা। তবে বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এ ছাড়া পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা বোর্ডে পাঠানোর নির্ধারিত সময়ের চার থেকে পাঁচ মাস আগেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়ে নিজেদের কাছে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর অল্প পরিমাণ টাকা জমা দেওয়া হয় বলেও দাবি করা হয়েছে। ফেল করানোর ভয়ে শিক্ষার্থীরা এসব বিষয়ে মুখ খুলতে চান না বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইন্টার্নশিপের সনদ না পাওয়ার অভিযোগ
ডিএএমএস পাস করার পরও অনেক শিক্ষার্থী ইন্টার্নশিপের সনদপত্র পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের মধ্যে মাগুরা পুলিশ লাইনপাড়ার খিজির হাসান, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারের আসাদ এবং পুলিশ লাইনের চিকিৎসক হাসানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন জেলায় ভুক্তভোগী রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মাগুরা পুলিশ লাইনপাড়ার খিজির হাসান জানান, তিনি ২০২২ সালে ডিএএমএস পাস করেছেন। কিন্তু এখনো ইন্টার্নশিপের সনদপত্র পাননি। তাঁর অভিযোগ, সনদ দেওয়ার জন্য অধ্যক্ষ ও প্রভাষক মোহিত কুমার সাহা অতিরিক্ত টাকা দাবি করেন এবং বিভিন্ন জিনিস কেনার কথা বলেন। এ বিষয়ে তিনি মাগুরা জেলা প্রশাসকের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মেহেদী হোসেন খোকার একরোখা মনোভাব এবং অধ্যক্ষের অর্থ আদায়ের প্রবণতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী
ইন্টার্নশিপের সনদপত্র থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
পাঁচ থেকে ছয় বছর বেতন বন্ধের অভিযোগ
মন্ত্রণালয় থেকে অডিট করতে এসে অধ্যক্ষ বাবুল হোসেন, প্রভাষক মোহিত কুমার সাহা ও প্রভাষক মফিজুর কবিরকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর কারণে তাঁদের পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে বেতন বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, অধ্যক্ষ বাবুল হোসেন প্রায় ১২ বছর ধরে দায়িত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এই সময়ে কোনো শিক্ষার্থীকে বৃত্তি বা ইন্টার্নশিপের বৃত্তির টাকা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।
তিন বছর আগে মাগুরার তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও কলেজের সভাপতি আবু নাসের বেগ ইন্টার্নশিপ বৃত্তির অর্থ প্রদানের আদেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেই বৃত্তির অর্থ শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। সরকার শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির টাকা দিলেও তা বিতরণ না হওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
নিয়োগ পরীক্ষা না নেওয়ার অভিযোগ
মাগুরা থেকে প্রকাশিত দৈনিক খেদমত পত্রিকায় ২০২২ সালে প্রকাশিত তথ্যের বরাতে অভিযোগ করা হয়েছে, তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. আশরাফুল আলমের দায়িত্ব পালনকালে কলেজের শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের পরীক্ষা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রভাষক পদে মাগুরা সদর উপজেলার পৌরসভার কাশীনাথপুর গ্রামের মো. ফারুক আহমেদ, শালিখা উপজেলার ধনেশ্বরগাতী ইউনিয়নের সিংড়া গ্রামের শেখর সরকার এবং মাগুরা শহরের জামরুলতলা গ্রামের এক নারীসহ বেশ কয়েকজন আবেদন করেছিলেন। তবে তাঁদের নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীদের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
পরীক্ষায় নকলের অভিযোগ
কলেজটির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক কোয়ালিফাইং পরীক্ষায় নকলের সুযোগ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এসব পরীক্ষায় হল সুপার ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীরা সরাসরি বই খুলে এবং বইয়ের ফটোকপি দেখে উত্তর লিখে থাকেন।
পরীক্ষার হলে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তিন ঘণ্টা অবস্থান করার কথা থাকলেও অনেক দিন তিনি পাঁচ থেকে ১০ মিনিট থাকেন, আবার কোনো কোনো দিন পরীক্ষার হলে যান না বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রভাষক সৈয়দ মেহেদী আক্তার খোকা, প্রভাষক মোহিত কুমার সাহা এবং একজন পিয়নের বয়স ৬০ বছরের বেশি হলেও তাঁরা এখনো পদে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কলেজ বন্ধ থাকার অভিযোগ
গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দুপুর ১২টার দিকে মাগুরা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি সাহেব আলী সরেজমিনে কলেজটি পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি কলেজের বারান্দায় তালা ঝুলতে দেখেন বলে জানানো হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অধ্যক্ষ বাবুল হোসেনের ট্রাক, মাইক্রোবাস, পিকআপ ও ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল। এসব যানবাহনের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রভাষক মোহিত কুমার সাহার বিরুদ্ধে অর্জিত অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, ঝিনাইদহের পাগলাকানাই এলাকার কাঠালবাগান গ্রামে তাঁর একটি দোতলা বাড়ি রয়েছে। একসময় তিনি ঝিনাইদহ বাজারে আলু, পটলসহ বিভিন্ন সবজির ব্যবসা করতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কলেজের টাকা আত্মসাৎ করে তিনি বাড়িটি নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অধ্যক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কলেজের অধ্যক্ষ বাবুল হোসেনের সঙ্গে সাংবাদিকেরা একাধিকবার সরাসরি ও মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস জেলা প্রশাসকের
কলেজের সভাপতি ও মাগুরার জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ বলেন, প্রফুল্ল সিংহ আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজের সভাপতি হিসেবে তিনি বিষয়টি কয়েক দিন আগে জেনেছেন। তিনি সাংবাদিক ফারুক আহমেদকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেছেন। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া পরীক্ষার সময় ম্যাজিস্ট্রেট তিন ঘণ্টা পরীক্ষার হলে অবস্থান করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
বোর্ডে নথি পাঠানোর দাবি
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ বোর্ড অব ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক সিস্টেম অব মেডিসিনের চেয়ারম্যান মল্লিকা খাতুন, রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান, বোর্ডের কন্ট্রোলার রুহুল আমীন, ডিজি হেলথ হাসান এবং বোর্ডের সদস্য আব্দুর রহমান ও আলমগীরের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কয়েকটি প্রমাণসংক্রান্ত নথি পাঠানো হয়েছে। অধ্যক্ষ বাবুল হোসেন ও প্রভাষক মোহিত কুমার সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগের সমর্থনে আপাতত দুজনের তথ্য পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত ভিডিও ও অডিও কলের রেকর্ড রয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে মাগুরার প্রফুল্ল সিংহ আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজকে রক্ষা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।