‘ও পলাশ, ও শিমুল, কেন এ মন মোর রাঙালে? জানি না জানি না আমার এ ঘুম কেন ভাঙালে-’উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী লতা মঙ্গেশকরের সাড়া জাগানো এ গানের মতো ‘অরণ্যের অগ্নিশিখা’ খ্যাত রাঙা পলাশ যুগে যুগে অসংখ্য গান, কবিতা ও সুরের উপজীব্য হয়েছে। বাংলা ভাষাভাষী কবি, শিল্পী ও সাহিত্যিকদের গানে ও কবিতায় সর্বত্রই পলাশ স্বমহিমায় জায়গা করে নিয়েছে। পলাশের ভুবনভোলানো রূপের ছটায় প্রেমে পড়েনি-এমন মানুষ মেলা ভার। শুধু কি তাই! মিষ্টি গানের পাখি কোকিল, লম্বা লেজ সবুজ টিয়া আর টুনটুনি-কে না মত্ত হয়েছে পলাশের বাসন্তী রঙে! তাই তো পলাশ-চূড়ায় বসে কোকিল তার কুহুতানে মাতিয়ে তোলে প্রকৃতিকে; সবুজ টিয়া ও টুনটুনি লেজ দুলিয়ে নাচানাচি করে পলাশ ফুলের ফাঁকে ফাঁকে।
উদ্ভিদবিজ্ঞান সূত্রে জানা যায়, শীতের বিদায়বেলায় সব পাতা ঝরে গিয়ে পত্রহীন পলাশ গাছে কুঁড়ি আসতে শুরু করে। গাঢ় লাল আর লালচে কমলা রঙের মিশেলে থোকায় থোকায় আগুনরাঙা পলাশ ফুল ফুটে ওঠে। গাছের আঁকাবাঁকা ডালের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত পলাশে ছেয়ে যায়। পলাশ হলুদ বর্ণের হলেও নড়াইলে সচরাচর তা দেখা যায় না। পলাশ ফুল তোতা পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো এবং ২ থেকে ৪ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্যের হয়ে থাকে। এর জীবনকাল অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী; ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ফুটতে শুরু করে মাত্র ২০-২৫ দিন স্থায়ী হয়। ফুল ঝরে গিয়ে আবারও গাছ নতুন কচি পাতায় ভরে ওঠে। দিগন্তসীমায় ফুটন্ত ফুলে ভরা পলাশ গাছ দেখে মনে হয় যেন বনে আগুন লেগেছে; তাই একে ‘অরণ্যের অগ্নিশিখা’ বা ‘ফ্লেম অব দ্য ফরেস্ট’ বলা হয়।
এ ছাড়া পলাশ কাঠ সহজে পচে না বলে একে ‘বাস্টার্ড টিক’ বা ‘জারজ সেগুন’ নামেও ডাকা হয়। অন্যদিকে পলাশ ফুল টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো হয় বলে এর আরেক নাম ‘প্যারট ট্রি’। এ ছাড়া কিংশুক, পলাশক, বিপর্ণক ইত্যাদি বর্ণিল বাংলা নামও রয়েছে পলাশের। পলাশ গাছ সর্বোচ্চ ১৫ মিটার উচ্চতার মাঝারি মাপের হয়ে থাকে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Butea monosperma। পলাশ ‘ফ্যাবেসি’ (Fabaceae) গোত্রীয় পর্ণমোচী বৃক্ষ। বীজ থেকেই এর বংশবিস্তার হয়ে থাকে।
এদিকে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রমতে, শরীরের ক্লান্তি দূর করতে ৩-৪টি কচি পলাশ পাতার রস সামান্য পানির সঙ্গে মিশিয়ে পান করা বেশ কার্যকর। ১ চামচ পরিমাণ পলাশ পাতার রস আধা গ্লাস পানিতে মিশিয়ে দিনে দুবার পান করলে বদহজম ও পেটের প্রদাহজনিত সমস্যায় ফল পাওয়া যায়। ঘন ঘন প্রস্রাবের সমস্যায় পলাশ পাতার ১ চামচ রস সামান্য পানির মিশ্রণে সকাল-বিকাল পান করলে উপশম মেলে।
এ ছাড়া পলাশ গাছের বাকল থেঁতলানো নির্যাস ১ চামচ ও কয়েকটি পলাশ বীজের পাউডার একত্রে আধা গ্লাস পানিতে মিশিয়ে পান করলে কৃমির উপদ্রব থেকে মুক্তি মেলে। এভাবে আরও নানা ঔষধি গুণাগুণ রয়েছে পলাশ গাছের।বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর নড়াইল জেলা সভাপতি শাহ আলম পলাশ-শিমুলকে ফাগুনের বার্তাবাহক উল্লেখ করে আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, ‘বসন্তে পলাশের অপরূপ রূপের ছটা শুধু নৈসর্গিক সাজ দেয় না, এর রক্তিম আভা মানবকুলকেও পুলকিত করে। বিবর্ণ ও বিষণ্ন মন নিমেষে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে এর চিত্তাকর্ষক রঙের বাহার অবলোকনে।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আগে রাস্তাঘাটে অনেক পলাশ গাছ দেখা গেলেও বর্তমানে নড়াইল শহরে হাতেগোনা কয়েকটি গাছ বেঁচে আছে। কথিত উন্নয়নের নামে নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের ফলে পলাশ আজ অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। তাই তো পথপ্রান্তর আলোকিত করে ফোটা পলাশের দেখা পাওয়া এখন ভার; প্রকৃতিতে বসন্ত কখন এসে বিদায় নেয় তা-ও ঠিকমতো বোঝা যায় না। পরিশেষে, বেশি করে পলাশ গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে বসন্তের শাশ্বত শোভা অক্ষুণ্ণ রাখতে সবাইকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান।