বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী ভোটে কোশি নদীতে হিমালয় থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নামলে এ বন্যা শুরু হয়। বন্যায় বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভেসে গেছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদকে জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ওই এলাকায় একটি ভূমিকম্প হয়। এর ফলে হিমবাহে ধস নামে এবং সেখান থেকেই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড) জানিয়েছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা ঘটনার প্রায় সাত মিনিট আগে ওই অঞ্চলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিকমত সিং আয়ের বিবিসি নেপালিকে জানান, নিখোঁজদের মধ্যে ৩৮৪ জন পর্যটকের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি ও ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। বিদেশিদের বড় অংশই তিব্বতের কৈলাশ মানসরোবরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।
নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয়, ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়, ১৭ জন মালয়েশীয়, ১২ জন ব্রিটিশ, ৪ জন দক্ষিণ আফ্রিকান, ৩ জন মার্কিন, ১ জন অস্ট্রেলীয় ও ১ জন ডাচ নাগরিক রয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, তাদের অন্তত ৮ জন নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এসব নাগরিক এলাকাটিতে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে যুক্ত ছিলেন। আরও ১১১ জনের জাতীয়তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নেপাল পুলিশ জানায়, বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে রাসুয়ায় ১ জন, নুয়াকোটে ৭ জন, ধাদিংয়ে ৬ জন ও গোর্খায় ৪ জন মারা যান। পরে হালনাগাদ হিসাবে মৃতের সংখ্যা ২২ জনে দাঁড়িয়েছে। রাসুয়ার তিমুরে থেকে নেপাল পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ৩২ জন সদস্য এখনো নিখোঁজ।
২০ মেগাওয়াটের লাংটাং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৬০ জন কর্মীর সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রকল্পের উদ্যোক্তা বিজয় মোহন ভট্টরাই বলেন, ‘২৫ জন প্রকৌশলী, চালক ও রান্নাঘরের কর্মী এবং আরও ৩৫ জন সুড়ঙ্গের ভেতরে কাজ করছিলেন। সকাল থেকে তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।’ তিনি জানান, প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল; দুই দিনের মধ্যে পরীক্ষা শুরুর কথা ছিল।
তিমুরের রাসুয়া কাস্টমস কার্যালয়ের প্রধান রাজেন্দ্র ঢুঙ্গানা জানান, তাদের ১৫ জন কর্মী নিখোঁজ।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজরাম বসনেত জানান, বন্যায় আটকে পড়া ৮৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। মাইলুং গ্রামের আরও ১১৫ জনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ১৩ জনকে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের স্থানীয়ভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। কিছু আহত ব্যক্তি ত্রিশূলি ক্যাম্পে চিকিৎসাধীন।
উদ্ধার অভিযানে ১২ থেকে ১৫টি হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি নেপাল সেনাবাহিনীর, বাকিগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাসুয়ার উদ্দেশে ২৯টি বেসরকারি ও ৬টি সামরিক হেলিকপ্টার উড়েছে। এর মধ্যে ২৩টি বেসরকারি ও ২টি সামরিক হেলিকপ্টার আহতদের নিয়ে কাঠমান্ডুতে ফিরেছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়া তিনটি হেলিকপ্টারকে ফিরে আসতে হয়েছে।
নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং এবং সংস্কৃতি, পর্যটন ও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী খড়ক রাজ পাউডেল ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয় করছেন।
কাঠমান্ডু-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং বলেন, নেপালের অংশে লেন্দে খোলা নদীতে বরফ-পাথরের ধসই এ বিপর্যয়ের কারণ, তবে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। তিনি বলেন, ‘নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী নদীর উজানে এখনো ধ্বংসাবশেষ জমে আছে। কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কা করছে।’
চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়, ধসটি নেপালের অংশে ঘটলেও তা তিব্বতের জিরং বন্দরে আঘাত হানে। এতে শিগাৎসে অঞ্চলের সড়ক, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, জিরং সীমান্তে অন্তত ৫৭৪ জন উদ্ধারকর্মী পাঠানো হয়েছে। এক উদ্ধারকর্মী সিসিটিভিকে জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দলটির কমপক্ষে চার ঘণ্টা লাগবে; কারণ পথে দেড় মিটার গভীর কাদা-পাথর জমে আছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের সন্ধানে ‘সর্বাত্মক’ অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি দ্বিতীয় দফার বিপর্যয় ঠেকাতে পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদারের কথা বলেছেন তিনি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, মানবিক সহায়তা দিতে নয়াদিল্লি প্রস্তুত। দুই দেশের দল উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় করছে।
নেপালের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, বন্যায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এটি দেশটির মোট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ৩ দশমিক ২ গিগাওয়াটের ১২ শতাংশেরও বেশি।
কাঠমান্ডুর মেয়র বালেন্দ্র শাহ জানান, উদ্ধারকাজে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে যুক্ত করা হয়েছে। নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষকে উঁচু স্থানে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নদীতীরের মানুষজনকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।’
রাসুয়ার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকে রয়টার্সকে বলেন, ‘যেদিকে তাকাই, শুধু ধ্বংসস্তূপ। নদীর পাশের বসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। আমার পাঁচজন আত্মীয় নিখোঁজ।’
জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার ভোটে কোশি নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বড় ধরনের প্রাণহানি বা সম্পদহানি হতে পারে।’
কাঠমান্ডুতে ব্যবসা করা চীনা ব্যবসায়ী ইয়ে লিয়াং বিবিসিকে জানান, বন্যাদুর্গত এলাকায় তার লজিস্টিকস কোম্পানির সাতটি কনটেইনার ট্রাক ছিল। তিনি বলেন, ‘সবার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কোনো সিগন্যাল নেই, কারও কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না।’
তিব্বতের অংশে সিচুয়ান প্রদেশের বাসিন্দা গুয়ান দাওশুয়ান বিবিসিকে জানান, বুধবার সকালে তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্ত্রী তিব্বতে সড়ক ও সেতু নির্মাণে যুক্ত একটি রাষ্ট্রায়ত্ত নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।
তিব্বত থেকে উৎপন্ন ভোটে কোশি নদী নেপালে ঢুকে ত্রিশূলি নদীতে মিশেছে। ত্রিশূলি পরে গণ্ডক নাম নিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। নেপাল সীমান্তবর্তী ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহার রাজ্যে বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
গত বছরও ভোটে কোশি নদীতে বন্যায় ৯ জন নিহত ও ২৪ জন নিখোঁজ হন। ওই বন্যায় নেপাল-চীন সীমান্তের মৈত্রী সেতু ভেসে যায়। এতে কয়েক মাস দুই দেশের বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যাহত হয়েছিল। আঞ্চলিক জলবায়ু পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছিল, তিব্বতের একটি হিমবাহ-উপরিভাগের হ্রদ ফেটে সে বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল।