জাপানের নাগোয়া ও আইচি প্রিফেকচারে শুরু হয়েছে ২০তম এশিয়ান গেমস। ৩০ হাজার আসনের স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বড় সংখ্যক আসন খালি থাকলেও বর্ণিল আয়োজনে কোনো কমতি ছিল না। তুলনামূলক শান্ত দর্শক উপস্থিতির মধ্যেই সম্পন্ন হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চ সাজানো হয়েছিল বিশাল হৃদয়ের আকৃতিতে, যেন পুরো আয়োজনের মধ্যেই ফুটে ওঠে একতার প্রতীকী বার্তা।
জাপানের সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী স্টেডিয়ামে আসন গ্রহণের পর তাদের সম্মান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) সভাপতি কার্স্টি কভেন্ট্রি।
রোববার সকালেই নির্ধারিত হবে আসরের প্রথম স্বর্ণপদক। পুরুষদের ব্যক্তিগত ট্রায়াথলন থেকে প্রথম সোনা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ৪ অক্টোবর পর্দা নামার আগে ৪০টির বেশি খেলায় লড়বেন এশিয়ার সেরা ক্রীড়াবিদরা।
অলিম্পিকের টিকিটের হাতছানি
নাগোয়া ও আইচিতে এবারের এশিয়ান গেমসে সাতটি খেলা থেকে ২০২৮ সালের অলিম্পিকে জায়গা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের পাশাপাশি অনেক ক্রীড়াবিদের সামনে রয়েছে অলিম্পিকে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
আসরে অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত তারকার পাশাপাশি উঠে আসা তরুণ প্রতিভারাও। সবার লক্ষ্য পদক, তবে অনেকের কাছে এই আসর ভবিষ্যতের বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগও।
শুরু থেকেই একের পর এক বিপত্তি
এশিয়ান গেমসের এবারের আয়োজন শুরু হওয়ার আগেই আয়োজকদের সামনে হাজির হয় নানা চ্যালেঞ্জ। ১১ হাজারের বেশি অ্যাথলেট ও প্রায় ৬ হাজার কর্মকর্তার আবাসনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে তাদের।
খরচ কমাতে এবার প্রচলিত ‘অ্যাথলেট ভিলেজ’ রাখা হয়নি। প্রতিযোগীদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে অস্থায়ী কনটেইনারের মতো কক্ষে, বিভিন্ন হোটেলে এবং ‘কোস্টা সেরেনা’ ক্রুজ জাহাজে।
এর মধ্যেই গত সপ্তাহে নাগোয়ায় রেকর্ড বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। এবার পূর্ব জাপানের দিকে ধেয়ে আসছে একটি টাইফুন। ফলে আগামী কয়েক দিনেও আবহাওয়ার কারণে আয়োজনে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবহন সময়মতো না আসায় কয়েকজন অ্যাথলেটকে বিমানবন্দরে আটকে থাকতে হয়েছে। কয়েকটি দল অস্থায়ী আবাসনের মান নিয়েও অভিযোগ করেছে। কোথাও কোথাও বিছানার দৈর্ঘ্য নিয়েও দেখা দিয়েছে সমস্যা।
উদ্বোধনের আগের দিনেও বিতর্ক
আয়োজনের শেষ মুহূর্তের বিপত্তিও কম যায়নি। শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার পুরুষ হকি দলের জন্য ভুল করে উত্তর কোরিয়ার জাতীয় সংগীত বাজিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসে আয়োজকদের প্রস্তুতি ও সমন্বয়।
তবে এতসব সমস্যার পরও এশিয়ার ৪৫টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ক্রীড়াবিদরা অংশ নিচ্ছেন এবারের আসরে। অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়া (ওসিএ) মনে করছে, বর্তমান সময়ে এশিয়ান গেমসের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
‘এশিয়ার ঐক্য দেখানোই বার্তা’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে ওসিএ সভাপতি শেখ জোয়ান বিন হামাদ আল-থানি বলেন, “উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বার্তা হলো এশিয়ার ঐক্য দেখানো এবং এশিয়ার বিভিন্ন সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সংঘাতের বিপরীতে এশিয়ার ঐক্য প্রদর্শন।”
আয়োজকরা জানিয়েছিলেন, সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। যদিও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে অনেক খালি আসন চোখে পড়ে।
জাপানের অ্যাথলেটরা মাঠে প্রবেশের সময় দর্শকদের মধ্যে যেমন উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, তেমনি সবচেয়ে বড় করতালি পেয়েছে চীনের দল।
চীনের সামনে শীর্ষে থাকার চ্যালেঞ্জ
২০২৩ সালে কোভিডের কারণে বিলম্বিত হাংঝু এশিয়ান গেমসে ঘরের মাঠে ২০১টি স্বর্ণসহ মোট ৩৮৩টি পদক জিতেছিল চীন। এবারও পদক তালিকার শীর্ষে থাকার প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নেমেছে দেশটি।
তবে এবারও তাদের সামনে থাকবে এশিয়ার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীরা। ফলে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত চলা প্রতিটি দিনের প্রতিটি ইভেন্টেই থাকবে পদকের উত্তাপ।
মাঠে নেমেছে আগেই
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শনিবার হলেও এশিয়ান গেমসের কিছু খেলা এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। বাস্কেটবল, ফুটবল ও ক্রিকেটের মতো কয়েকটি ডিসিপ্লিনের প্রতিযোগিতা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগেই মাঠে গড়িয়েছে।
১৯৫১ সালে যাত্রা শুরু করা এশিয়ান গেমসে বরাবরের মতো এবারও অ্যাথলেটিকস ও সাঁতারের মতো অলিম্পিকের জনপ্রিয় ইভেন্টের পাশাপাশি থাকছে সেপাক তাকরাও ও কাবাডির মতো আঞ্চলিক জনপ্রিয় খেলাও।
নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই আসর শেষ পর্যন্ত কতটা জমে ওঠে, তার উত্তর মিলবে আগামী দুই সপ্তাহে। তবে উদ্বোধনের মঞ্চে অন্তত একটি বার্তা স্পষ্ট—প্রতিযোগিতার মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও এশিয়ার ক্রীড়াঙ্গনকে এক সুতোয় বাঁধার স্বপ্নটাই বড়।