আসন্ন মাগুরা পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের নিয়ে যখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তুঙ্গে, তখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নামগুলোর মধ্যে অন্যতম মাসুদ হাসান খাঁন কিজিল। তৃণমূল নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের বিশ্বাস, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনসম্পৃক্ততার কারণে তিনি মেয়র পদে একজন শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী।
মাগুরা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের আবালপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাঁন পরিবারের কৃতি সন্তান মাসুদ হাসান খাঁন কিজিল। তার পিতা মরহুম ওয়াজেদ আলী খাঁন ছিলেন মাগুরা পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান। ১৯৬৫ সালে তিনি পৌরসভার নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। সেই পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় জনসেবা ও নেতৃত্বের চর্চা আজও বহমান। মা মনোয়ারা বেগম স্থানীয়ভাবে একজন রত্নগর্ভা মা হিসেবে পরিচিত।
ছয় ভাই ও চার বোনের মধ্যে সেজো পুত্র মাসুদ হাসান খান কিজিল এমন একটি পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, যেখানে শিক্ষা, নেতৃত্ব ও দেশসেবার মূল্যবোধ ছিল পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ। পরিবারের বড় ভাই মনোয়ার হোসেন খান জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় এবং মাগুরা-১ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য এমপি। অন্য ভাইদের মধ্যে কর্নেল জাহিদ খাঁন দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থান করছেন, নিয়াজ খাঁন ২৭তম বিসিএস ক্যাডার ও বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী, কর্নেল শাহরিয়ার খাঁন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ছোট ভাই আবির হাসান খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা অবস্থায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চাকরি হারিয়ে বর্তমানে ফিনল্যান্ডে অবস্থান করছেন। তবে পারিবারিক পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছেন মাসুদ হাসান খাঁন কিজিল।
তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে মাগুরা সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সদস্য হিসেবে। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজপথের আন্দোলন, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সালে পৌর যুবদলের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তার নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক বিকাশ শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১১ সালে মাগুরা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড থেকে বিপুল ভোটে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
একই সময়ে পৌর বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পৌর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০২০ সালে আহ্বায়ক এবং ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত পৌর বিএনপির দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলে সরাসরি ভোটে সভাপতি নির্বাচিত হন। দলীয় সিনিয়র নেতাকর্মীদের মতে, এটি ছিল পৌর বিএনপির ইতিহাসে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও উৎসবমুখর কাউন্সিল, যেখানে তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ সমর্থনে তিনি নেতৃত্বের শীর্ষস্থানে পৌঁছান।
রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি হলো দুঃসময়ে দলের পাশে অবিচল থাকা। বিগত সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে ১৬টির অধিক
রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়। গ্রেপ্তার, হয়রানি ও কারাবরণ সত্ত্বেও তিনি কখনো দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেননি। বরং সংকটময় সময়ে নেতাকর্মীদের সাহস জুগিয়েছেন, সংগঠনকে সুসংগঠিত রেখেছেন এবং রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থেকেছেন।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভাষায়,“কিজিল ভাই শুধু সুসময়ের নেতা নন, দুঃসময়েরও অভিভাবক।” দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি বিএনপির একজন পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
রাজনীতির পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডেও তিনি রেখেছেন উজ্জ্বল উপস্থিতি। করোনা মহামারির সময় যখন মানুষ আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছিল, তখন ব্যক্তিগত ও দলীয় উদ্যোগে ওষুধ, অক্সিজেন, মাস্ক এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাগুরার ১০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ৫ আগস্ট ভায়না মোড়ে অনুষ্ঠিত গায়েবি জানাজায় ইমামতি করেন তিনি। পরবর্তীতে নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ান, আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন এবং মরদেহ দাফনের ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখেন। আন্দোলনের সেই সময়টিতে তিনি জুলাইয়ের সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন। এছাড়াও অসহায় মানুষের চিকিৎসা সহায়তা, দরিদ্র পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণে ঢেউটিন প্রদান, শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ, ত্যাগী বিএনপি নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলেন, “মাসুদ হাসান খাঁন কিজিল দীর্ঘদিন ধরে দলের দুঃসময়ে রাজপথে সক্রিয় থেকেছেন। সংগঠনের প্রতি তার নিষ্ঠা ও ত্যাগ তাকে নেতাকর্মীদের আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে। তিনি মেয়র প্রার্থী হলে দলের জন্য শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হবেন।”
পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনজুম হাসান সুমন বলেন, “কিজিল ভাই সবসময় কর্মীদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকেন। রাজনৈতিক প্রতিকূল সময়েও তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার মতো ত্যাগী নেতার নেতৃত্বে পৌরসভার উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আব্দুর রহিম বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ছাত্রনেতা জুলফিকার আলী বলেন, সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে কিজিল ভাই সবচেয়ে যোগ্যদের একজন। কারণ আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং কর্মীদের পাশে থেকেছেন।
পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক উৎপল কাজী বলেন, সংগঠনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তার অবদান অসামান্য। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক তাকে দলের অন্যতম জনপ্রিয় নেতায় পরিণত করেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাগুরার মতো রাজনৈতিকভাবে সচেতন এলাকায় শুধু দলীয় পরিচয় নয়,ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। এসব সূচকে মাসুদ হাসান খান কিজিল ইতোমধ্যে নিজস্ব একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
দীর্ঘ প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক পথচলায় ছাত্রদলের একজন কর্মী থেকে পৌর বিএনপির সভাপতির দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়া মাসুদ হাসান খাঁন কিজিলের জীবনগাঁথা মূলত ত্যাগ, সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও জনসেবার এক অনন্য ইতিহাস। তার সমর্থকদের কাছে তিনি বিএনপির একজন পরীক্ষিত সৈনিক, আর সাধারণ মানুষের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত এক রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব।আসন্ন মাগুরা পৌরসভা নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, তাকে ঘিরে আলোচনা ও প্রত্যাশাও তত বাড়ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের আস্থা, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কারণে তিনি ইতোমধ্যেই পৌর নির্বাচনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।